কতটা ভয়ংকর ইরানের জানফাদা কর্মসূচি? 

যুদ্ধের আশঙ্কা, রাজপথে অস্ত্র প্রশিক্ষণ, রাতভর সরকারপন্থী সমাবেশ আর লাখো মানুষের অংশগ্রহণের দাবি, ইরানে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে জানফাদা কর্মসূচি। দেশটির কর্তৃপক্ষের ভাষায়, এটি আত্মত্যাগে প্রস্তুত নাগরিকদের সংগঠিত করার উদ্যোগ; লক্ষ্য রাষ্ট্র ও বিপ্লবের মূল্যবোধ রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি হুমকি মোকাবিলা। কিন্তু এই কর্মসূচি ঘিরে প্রশ্নও বাড়ছে। সাধারণ মানুষকে অস্ত্র চালানো শেখানোর উদ্দেশ্য কী, স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি দাবির ভিত্তি কতটা এবং রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের এই আয়োজন ইরানের সমাজে কী প্রভাব ফেলছে?

মার্চের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যে জানফাদা কর্মসূচি শুরু হয়। ফারসি শব্দটির অর্থ আত্মত্যাগে প্রস্তুত ব্যক্তি বা নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত মানুষ। কর্মসূচির আওতায় নারী-পুরুষকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। তরুণদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও এতে অংশগ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত বাসিজ মিলিশিয়া এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রতিনিধিরা বিভিন্ন শহরের সড়ক ও জনসমাগমস্থলে অস্থায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনা করছেন। সেখানে অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তেহরান, ইসফাহান, জানজান, শিরাজ, কেরমান, মাশহাদ, বোজনুর্দ ও আহভাজসহ বিভিন্ন শহরে কর্মসূচির অংশ হিসেবে সমাবেশ ও সশস্ত্র মহড়া হয়েছে।

রাজধানী থেকে ৩১ প্রদেশে বিস্তারের পরিকল্পনা

কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে আইআরজিসি। বাসিজের প্রশিক্ষণবিষয়ক উপপ্রধান আলি কাউসারি চলতি মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তেহরানের অন্তত ১৪টি প্রধান চত্বরে জানফাদা স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় বাহিনীটি। একই সঙ্গে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রতিটি রাজধানীতে অন্তত এক থেকে তিনটি প্রধান চত্বর ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তবে বর্তমানে কতটি শহরে এই কর্মসূচি চলছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

কর্মসূচির আওতায় শুধু দিনের বেলার সমাবেশ নয়, রাতে মিছিল ও মোটরবহরও দেখা যাচ্ছে। উত্তর ইরানের গিলান প্রদেশের এক বাসিন্দা আল জাজিরাকে জানান, বড় শহর থেকে ছোট শহর পর্যন্ত সড়কে নিয়মিত এসব আয়োজন চোখে পড়ে। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বাসিন্দা বলেন, কোথাও কোথাও ছোট পুরস্কার জেতার প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি মানুষকে গুলি, পিস্তল ও অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহারের বিভিন্ন ধাপ শেখানো হয়।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, আয়োজকদের মধ্যে বয়স্ক পুরুষের সংখ্যাই বেশি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাঁরা প্রায় প্রতি রাতেই প্রধান চত্বরে জড়ো হচ্ছেন। সেখানে বিপ্লবী সংগীত বাজানো ও মাইকে স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

তবে এসব আয়োজন নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষের খবরও এসেছে। গিলান প্রদেশের রাশত শহরে ১৫ অক্টোবর রাতের একটি সরকারপন্থী সমাবেশ ঘিরে শব্দদূষণ ও সড়ক আটকে রাখার প্রতিবাদ জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আয়োজকদের সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা গেছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি। আবার রাজধানী তেহরানের কাছের আলবোরজ প্রদেশের কারাজে একটি মহড়াকে কেন্দ্র করে বিস্ফোরণ ও বিকট শব্দ হতে পারে বলে বাসিন্দাদের সতর্কও করা হয়।

নিরাপত্তার প্রস্তুতি, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রদর্শন?

ইরানের কর্তৃপক্ষ জানফাদাকে জাতীয় সংহতি ও রাষ্ট্রের প্রতি জনসমর্থন প্রদর্শনের কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরছে। আইআরজিসির লোরেস্তান প্রদেশের কমান্ডার নেমাতোল্লাহ বাঘেরি গত সপ্তাহে বলেন, সরকার যেমন জনগণকে সমর্থন করে, তেমনি জনগণও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ইসলামি বিপ্লবকে সমর্থন করে, এটি দেখানোই কর্মসূচির লক্ষ্য।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দিস্তান প্রদেশের রাজধানী সানানদাজেও গত সপ্তাহে বড় পরিসরে কর্মসূচি হয়। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিম ওই আয়োজনকে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের প্রদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকটি ইরানি মানবাধিকার সংগঠন এই ধরনের সশস্ত্র জনমোবিলাইজেশনকে ভিন্নভাবে দেখছে। তাদের ভাষ্য, জানুয়ারির দেশব্যাপী বিক্ষোভে প্রাণহানির কয়েক মাস পর এ ধরনের আয়োজন সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করার প্রচেষ্টা হতে পারে।

জানুয়ারির বিক্ষোভে হাজারো বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার স্বীকার করেছে, দেশের সব প্রদেশের চার শতাধিক কাউন্টিতে বিক্ষোভ হয়েছিল। তবে কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-পরিকল্পিত অভ্যুত্থানের চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছে। বিক্ষোভ দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল বলে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন অনুসন্ধানী মিশনের দেওয়া বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান সরকার।

কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক মেহরান কামরাভার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে বিপ্লবী আদর্শে বিশ্বাসী অংশগুলোর সক্রিয়তা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর বিশ্লেষণ, জানফাদার প্রশিক্ষণ ও সমাবেশের মাধ্যমে নেতৃত্বের বিপ্লবী আদর্শের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এমন কর্মসূচি রাষ্ট্রের প্রতি পুরো সমাজের সমর্থন বাড়ায়, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং যারা আগে থেকেই রাষ্ট্রের সমর্থক, তাদের মধ্যে বিদ্যমান আনুগত্য আরও দৃঢ় হতে পারে।

৩ কোটি ৩০ লাখ স্বেচ্ছাসেবীর দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

জানফাদা কর্মসূচির ওয়েবসাইটে ৩ কোটি ৩০ লাখ ইরানি নিবন্ধন করেছেন বলে দাবি করেছে সরকার। সংখ্যাটি সত্য হলে তা দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। তবে এই দাবির পক্ষে কর্তৃপক্ষ কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি।

এ বছরের শুরুতে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন কর্মী ওয়েবসাইটটির সোর্স কোড পরীক্ষা করে জানান, সেখানে নিবন্ধিত মানুষের সংখ্যা ৪০ লাখেরও কম দেখা গিয়েছিল। নিবন্ধনের জন্য শুধু একটি ফোন নম্বর প্রয়োজন হতো; জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বাধ্যতামূলক ছিল না। ফলে সরকারি ঘোষিত সংখ্যা ও ওয়েবসাইটের তথ্যের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। তবে ওয়েবসাইটের ওই তথ্য দিয়ে বর্তমানে নিবন্ধিত মানুষের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা যায় না।

কর্মসূচিতে নাম লেখানো ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে উদ্ধার অভিযান, সামাজিক সেবা, গণমাধ্যম ও আর্থিক সহায়তার কাজে ব্যবহার করার কথাও জানিয়েছে আয়োজকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ, নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপে দেশের সম্পদের ওপর চাপ কমাতে স্বেচ্ছাসেবীদের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার কমানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।

শিশুদেরও যুক্ত করা হচ্ছে

জানফাদা কর্মসূচিতে শিশু ও শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। গত সপ্তাহে ইরানের শিক্ষামন্ত্রী আলিরেজা কাজেমি জানান, বাসিজ মিলিশিয়া শিক্ষার্থী জানফাদা সদস্যদের নিবন্ধন করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে শিশুদের নিয়ে আরও জনমোবিলাইজেশন ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে তিনি জানান।

এমন উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। কারণ, কর্মসূচিটি শুধু সামাজিক সেবা বা উদ্ধারকাজে স্বেচ্ছাসেবী সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর অংশ হিসেবে অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ এবং সশস্ত্র মহড়াও চলছে। একই সঙ্গে স্কুলপর্যায়ে শিশুদের যুক্ত করার পরিকল্পনা কর্মসূচির পরিধি ও উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

কতটা ভয়ংকর এই জানফাদা কর্মসূচি?

জানফাদাকে সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতি বা সাধারণ মানুষকে যুদ্ধে পাঠানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য আল জাজিরার প্রতিবেদনে নেই। কর্তৃপক্ষ বলছে, স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্ধার অভিযান ও সামাজিক সেবাসহ নানা কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। কিন্তু অস্ত্র প্রশিক্ষণ, সশস্ত্র মহড়া, রাজপথে নিয়মিত সমাবেশ এবং শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা কর্মসূচিটিকে সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের চেয়ে অনেক বিস্তৃত রূপ দিয়েছে।

এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে সরকার জনসমর্থন ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের দৃশ্যমান প্রদর্শন চাইছে। অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিবাদের ঘটনা দেখাচ্ছে, কর্মসূচিটি সবার কাছে একইভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। নিবন্ধনের সংখ্যা নিয়ে সরকারি দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

অধ্যাপক কামরাভার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মসূচি রাষ্ট্রের বিদ্যমান সমর্থকদের মধ্যে বিপ্লবী আদর্শের প্রতি বিশ্বাস আরও শক্ত করতে পারে। তবে বৃহত্তর সমাজের সমর্থন কতটা বাড়ছে, তা আলাদা প্রশ্ন। সব মিলিয়ে, জানফাদার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক শুধু এর ব্যাপকতা নয়; বরং বেসামরিক মানুষকে অস্ত্র প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে এই আয়োজনকে যুক্ত করা। কর্মসূচিটি ভবিষ্যতে ঠিক কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা স্পষ্ট নয়, কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এর বিস্তার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। সূত্র: আলজাজিরা