’যারা বলেন নিষেধাজ্ঞার কোনো প্রভাবই নেই ,তাঁদের কী বলব, আমি জানি না’

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে দেশটির তেল রপ্তানি, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের (ট্রেজারি) একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, গত ২৫ আগস্টের পর থেকে কোনো জাহাজে তেল বোঝাই করতে পারেনি ইরান। একই সঙ্গে স্থলপথের বাণিজ্যেও সীমান্তে বাধা ও পরিবহনসংকট তৈরি হয়েছে।

‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট: ইরানের বিচ্ছিন্নতা সংখ্যার হিসাবে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ আগস্ট অভিযান শুরুর পর থেকে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দর প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। বেড়েছে মূল্যস্ফীতিও।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরে ইরানের অনানুষ্ঠানিক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময়মূল্য দাঁড়ায় ২৬ লাখ ৮৭ হাজারে। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে বছরওয়ারি মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে।

নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। আগস্টে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বলেন, নিষেধাজ্ঞার কোনো প্রভাবই নেই। তাঁদের কী বলব, সত্যিই আমি জানি না।’

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি জানিয়েছে, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস বন্ধ করা। ২৪ আগস্ট শুরু হওয়া এই অভিযানের অংশ হিসেবে দেশটির সমুদ্রপথের বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ আগস্টের পর কোনো জাহাজে তেল বোঝাই করেনি ইরান। সমুদ্রে আটকে থাকা অবশিষ্ট তেলও দেশটি বিক্রি করে দিয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন ট্রেজারি।

তেল সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষণেও রপ্তানি কমার চিত্র উঠে এসেছে। কেপলারের তথ্য এবং মার্কিন ট্রেজারি কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, ইরানি বা ইরানি উৎসের বলে সন্দেহ করা তেলের পরিচিত গন্তব্যে খালাসের ৩০ দিনের গড় পরিমাণ ১৯ অক্টোবর নাগাদ প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। অভিযান শুরুর সময় এই পরিমাণ ছিল প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি।

মার্কিন ট্রেজারি এই পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও লক্ষ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছে।

সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ইরান স্থলপথে পণ্য পরিবহনের চেষ্টা বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তুরস্ক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে পণ্য পরিবহনে জট তৈরি হয়েছে।

ট্রেজারির মূল্যায়ন অনুযায়ী, তুরস্ক সীমান্তে হাজার হাজার ট্রাক আটকে পড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় ২০ দিন পর্যন্ত পৌঁছেছে। পাকিস্তান সীমান্তেও শত শত ট্রাক অপেক্ষায় রয়েছে।

ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলও মার্কিন চাপের আওতায় এসেছে বলে জানিয়েছে ট্রেজারি। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে বিদেশি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করতে বিভিন্ন দেশে দল পাঠানোর কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, ইরাক, জর্জিয়া ও আজারবাইজান ইরানের সব এয়ারলাইনসের ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছে এবং ইরানের সঙ্গে সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। তবে ইরাকের নাজাফে ধর্মীয় সফরের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় রয়েছে। তুরস্ক মাহান এয়ারের সব ফ্লাইট বন্ধ করেছে।

এ ছাড়া কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস, টার্কিশ এয়ারলাইনস ও পেগাসাসের মতো বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোও ইরানগামী রুটে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়িয়েছে।

মার্কিন ট্রেজারির দাবি, সীমিত উড়োজাহাজ নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ইরান এয়ার পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিমান চলাচলে বিধিনিষেধের প্রভাব পড়ছে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন শিল্পেও।

ইরানের চেম্বার অব কমার্সের এক কর্মকর্তা অর্থনৈতিক দৈনিক দুনিয়া-ই-ইকতেসাদকে বলেছেন, ‘ঘেরাওয়ের বৃত্ত দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।’ সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রাপ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

বাণিজ্য ও পরিবহন যোগাযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি ইরানের বৈদেশিক আর্থিক লেনদেনের পথ বন্ধ করতেও তৎপরতা বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন ট্রেজারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কের নিয়ন্ত্রক সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা গোল্ডেন গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং মার্কিন তালিকাভুক্ত ব্যাংক মেল্লাতের পরিচালন লাইসেন্স বাতিল করেছে। লেবাননও ব্যাংক সদরাতের একটি ইরানি শাখার লাইসেন্স বাতিল করেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্যাংক মেল্লি ইরানের শাখাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং মার্কিন ট্রেজারির পদক্ষেপের পর বানক মিসর ইউএইর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের ক্ষেত্রে অনুমোদন না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে।

এ ছাড়া ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়ার পথ সহজ করে দেয়—এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি। প্রতিবেদনে ইরানের পাশাপাশি তেহরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহযোগিতার অভিযোগে ইরাকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংককে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রচলিত ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক চ্যানেল সংকুচিত হওয়ায় ইরানের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে বলে দাবি করেছে মার্কিন ট্রেজারি। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি।

নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কাজে ব্যবহারের অভিযোগে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ, ডিজিটাল ওয়ালেট ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২ জুন নোবিটেক্স, ওয়ালেক্স, বিটপিন ও রামজিনেক্স নামের চারটি ইরানি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়। পরে ৭ আগস্ট আবান টেথার এবং আরও একটি ইরানি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বিটব্যাংকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মার্কিন ট্রেজারির মতে, তেলের আয় কমে যাওয়া, রিয়ালের দরপতন এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনে বিধিনিষেধ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে ইরানের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ অব্যাহত থাকবে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে জেনেশুনে সহযোগিতা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরও মার্কিন পদক্ষেপ আসতে পারে বলেও সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন।