দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দীর্ঘ আট দশকের যে 'নিয়ম-নির্ভর' বিশ্বব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল, তা আজ চূড়ান্ত ভাঙনের মুখে। বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পরাশক্তিগুলোর পেশিশক্তির লড়াইয়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে কানাডা ও ইউরোপের মতো 'মধ্যম শক্তির' রাষ্ট্রগুলো।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাম্প্রতিক অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে এই অশনিসংকেত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
এক সময় আমেরিকাকে হিতৈষী শক্তি মনে করা হলেও বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। গত সপ্তাহে দাভোসে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি তাঁর অবজ্ঞা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
ন্যাটোতে মিত্রদের অবদান নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর মন্তব্যকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার 'অত্যন্ত অপমানজনক' বলে অভিহিত করেছেন। আমেরিকার এই এককেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চা এখন কেবল শত্রু দেশ নয়, বরং তাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ওপরও আছড়ে পড়ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দাভোসে এক কঠোর বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন আর কোনো রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না, বরং এটি একটি বড় ধরনের 'বিচ্ছেদ'। শক্তিশালী দেশগুলো যখন আন্তর্জাতিক নিয়ম মানার ভান ছেড়ে নিজের স্বার্থে বাণিজ্য শুল্ক বা সামরিক শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন মধ্যম শক্তির দেশগুলো আর নিরাপদ থাকে না।
কার্নি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি আপনি আলোচনার টেবিলে জায়গা না পান, তবে বুঝে নেবেন আপনি অন্যের খাবারের মেনুতে (ভোগ্যবস্তু) পরিণত হয়েছেন।’
বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের এই নীতিকে ১৯ শতকের 'মনরো ডকট্রিন'-এর সাথে তুলনা করছেন, যেখানে আমেরিকা নিজের গোলার্ধকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে চাপ বা মিত্রদের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা সেই স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। এই অস্থিতিশীলতা বিশ্বকে আবারও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব অরাজকতায় ফিরিয়ে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের এই ভঙ্গুর বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সামনে এখন একটাই পথ—নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং নতুন কোনো শক্তিশালী জোট গঠন করা।