ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে অন্তত ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এর তথ্য অনুযায়ী, এই ভয়াবহ দুর্যোগে আহত হয়েছেন ১ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ। ধসে পড়া শত শত ভবনের কংক্রিটের স্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন।
স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলায় এই দুর্যোগ নেমে আসে। ওই দিন দেশটিতে সরকারি ছুটি থাকায় অধিকাংশ মানুষই নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ইউএসজিএস জানায়, প্রথমে ৭.২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে এবং তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরই আঘাত করে আরও তীব্র ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি। দুটি ভূমিকম্পই ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি (প্রথমটি ২০.৩ কিলোমিটার এবং দ্বিতীয়টি মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে) হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতা এত বেশি হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট জর্জ রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে প্রায় ২৫০টি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মধ্যে উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে একটি ১০ তলা হোটেল ভেঙে ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে বিবিসি। রাজধানী কারাকাস ছাড়াও ত্রুহিলো, ইয়ারাকুই, কারাবোবো, আরাগুয়া এবং মিরান্ডা অঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্যোগের পর অন্তত ৩০টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির কারণে কারাকাসের উপকণ্ঠে অবস্থিত দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কারাকাস থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে তুকাকাস উপকূলে আরেকটি বহুতল হোটেল ধসে পড়ার ভিডিও নিশ্চিত হওয়া গেছে। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) সতর্ক করে বলেছে, মৃতের সংখ্যা আরও ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে। পূর্বের একই ধরনের ভূমিকম্পের ইতিহাস ও জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সংস্থাটি ধারণা করছে, এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ৪২ শতাংশ এবং ১ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ৩৩ শতাংশ। ইউএসজিএস-এর রেকর্ড অনুযায়ী, এবারের দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি ১৯০০ সালের পর ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন। এর আগে ১৯৬৭ সালে কারাকাসে আঘাত হানা এক ভূমিকম্পে ২০০ জন মারা গিয়েছিলেন। এই কম্পনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, শত শত কিলোমিটার দূরে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা থেকেও এটি অনুভূত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার এই মহাবিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ লিখেছেন, ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের ওপর আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পটি বিশাল মাত্রার এবং এটি ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও সক্ষম।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, তারা দ্রুত অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলাকে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (১১৩ মিলিয়ন পাউন্ড) সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্রুত ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য পরিবহন জাহাজ ও বিমান পাঠাচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, মেক্সিকো এবং কাতার থেকে উদ্ধারকারী দল ও জরুরি সহায়তা ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাতে শুরু করেছে। সূত্র: বিবিসি