ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে গেছে। এবার সেই ঘাটতি পূরণে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে পেন্টাগন। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার মজুত কয়েক গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে মার্কিন সেনাবাহিনী।
২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণ পিএসি-৩ এমএসই কেনার লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার ৩৭৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩ হাজার ৭৭৩ করা হয়েছে। আগের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই সংখ্যা চার গুণেরও বেশি।
মার্কিন সেনাবাহিনীর বাজেট নথি বলছে, গত কয়েক বছর পিএসি-৩ এমএসই কেনার পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। ২০২২ অর্থবছরে ৩২৮টি ক্ষেপণাস্ত্র কেনা হলেও ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৫২টিতে। ২০২৪ সালে কেনা হয় ২৩০টি এবং ২০২৫ সালে মাত্র ২১৪টি। ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে সংখ্যা বাড়িয়ে ৩২০টি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
ইরান যুদ্ধে কমেছে মজুত
রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ফক্স নিউজ জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাসের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের এটিএসিএমএস এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলের মজুত প্রায় পুরোপুরি ব্যবহার হয়ে গেছে। একই সময়ে প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অস্ত্রও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমেরি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অস্ত্রঘাটতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। গত ২৫ বছর ধরে দেশটি পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র কেনেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পিএসি-৩ এমএসই এবং টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দুটি ব্যবস্থা। প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা তুলনামূলক কম উচ্চতায় সেনা, বিমানঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করে। থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে আরও বেশি উচ্চতা ও দূরত্বে ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়।
থাডেও বড় পরিবর্তন
থাড ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ক্ষেত্রেও এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ছিল সীমিত। ২০২৪ অর্থবছরে ১১টি এবং ২০২৫ সালে ১২টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র কেনা হয়। ২০২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে ২৫টির জন্য অর্থ রাখা হয়েছিল। পরে আরও ১২টির জন্য অর্থ যোগ হওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭টি।
২০২৭ অর্থবছরে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। ওই বছর ৮৫৭টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য অর্থ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি নিয়মিত বাজেটের অর্থে এবং ৮৩০টি বিশেষ সামরিক তহবিলের অর্থে তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাজেটে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র কেনার পরিকল্পনা করলেই দ্রুত মজুত পূরণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অর্থ অনুমোদনের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
রাতারাতি বাড়বে না উৎপাদন
পিএসি-৩ এমএসই ও থাডের মতো উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে বিশেষায়িত কারখানা এবং জটিল সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন। রকেট মোটর, লক্ষ্য শনাক্তকারী যন্ত্র, নির্দেশনা ব্যবস্থা ও বিস্ফোরক উপাদানের উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো কঠিন।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ৬২০টি পিএসি-৩ এমএসই এবং ৯৬টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদিত ক্ষেপণাস্ত্রের একটি অংশ বিদেশে বিক্রি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুত বৃদ্ধির গতি আরও কমেছে।
প্রতিরক্ষা শিল্পের গবেষক জিম ফেইনের মতে, এই ঘাটতি আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব ছিল। প্রতিরক্ষা বাজেটের অর্থ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ভাগ করার সময় নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলেই ক্ষেপণাস্ত্র কেনাকাটা পিছিয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
চীন নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পরিকল্পনার পেছনে বড় কারণ চীন। সম্ভাব্য সংঘাতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও বাহিনীর ওপর চীন ব্যাপক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সে ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে এবং অনেক বড় মাত্রায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে হতে পারে। ফলে এখন শুধু ক্ষয় হওয়া মজুত পূরণ নয়, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য বড় ভাণ্ডার গড়ে তোলার দিকে নজর দিচ্ছে পেন্টাগন।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের হিসাবে, চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ন্যূনতম কার্যকর মজুত হিসেবে প্রয়োজন হতে পারে ৭ হাজার ৮২টি পিএসি-৩ এমএসই এবং ১ হাজার ৩৯৪টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত মজুতের পরিমাণ গোপন রাখা হয়েছে।
বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে এই মাত্রার মজুত গড়ে তুলতে কয়েক বছর নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে বিশ্লেষণটিতে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে যে ঘাটতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, তা পূরণে শুধু নতুন ক্ষেপণাস্ত্র কেনাই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: ফক্স নিউজ