ইরানের সঙ্গে অচলাবস্থায় থাকা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবার কৌশল বদলাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় থাকা মার্কিন প্রতিনিধিদের আপাতত যোগাযোগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত হামলা চালিয়ে ইরানকে চাপে ফেলার বদলে দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বজায় রাখার পথে এগোচ্ছেন তিনি। তবে ছয় মাসের যুদ্ধে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তে থাকা চাপ এবং যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্যও ট্রাম্পের নতুন অবস্থানের পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ইরানের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে অচলাবস্থার মধ্যে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) হোয়াইট হাউসে নতুন কৌশলের ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প। এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় থাকা মার্কিন দলের সদস্যদের তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
এই দলে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা কথোপকথন চলছে না এবং নতুন কোনো আলোচনাও নির্ধারিত হয়নি। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
তবে ট্রাম্পের এই দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পুরোপুরি মিল নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি; বরং তা অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো এখনো ইরানি হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রশাসন বারবার দাবি করেছিল, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে এবং একটি নতুন চুক্তি দ্রুতই হতে পারে। এমনকি ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত কুশনারও সোমবার জানিয়েছিলেন, তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সক্রিয়।
কুশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিনিধিরা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন এবং আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতিও হচ্ছিল। কিন্তু ট্রাম্প তেহরানের পক্ষ থেকে তাঁর শর্ত মেনে নেওয়ার মতো যথেষ্ট আগ্রহ দেখতে না পাওয়ায় আবারও আলোচনায় বসতে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছেন বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইরান অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চলছে, এমন দাবি বারবার অস্বীকার করেছে। তেহরানের এই অস্বীকৃতিতে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে চলমান আলোচনাও ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ইরান ও ওমান, দুই দেশেরই এই কৌশলগত জলপথে উপকূল রয়েছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, সম্ভাব্য সমঝোতায় পারস্য উপসাগরে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজ চলাচলে দুই দেশের ভূমিকা নির্ধারণের বিষয়টি থাকতে পারে।
হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, এমন কোনো ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে পারে। জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো ধরনের ফি বা অর্থ নেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি রয়েছে ওয়াশিংটনের।
ট্রাম্প চান, যুদ্ধের আগের মতো হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়াই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হোক। তাঁর প্রশাসনের ভাষ্য, কোনো দেশকে এই আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে।
যদিও ট্রাম্প মঙ্গলবারও বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। বাস্তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের ওপর নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতিও নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই নতুন নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর রাখার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত ইরানকে মার্কিন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করবে। অন্যদিকে ইরানের কর্মকর্তারা মনে করছেন, যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাজনৈতিক চাপ এখন ট্রাম্পের ওপরই বেশি।
ছয় মাসের যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদের দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন জাহাজ ও নাবিকদের ওপর চাপ তৈরি করেছে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, উন্নত ধরনের কিছু মার্কিন অস্ত্রের মজুত তাঁর পছন্দের পর্যায়ে নেই।
তারপরও যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজার জন্য রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকে চাপ এলেও এতদিন ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বারবার বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে তাঁর ওপর কোনো সময়ের চাপ নেই।
বরং মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরমুজ প্রণালির একটি মানচিত্রের ওপর ইউএস টেরিটরি লেখা একটি ছবি প্রকাশ করে ট্রাম্প আরও ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন। ফলে আলোচনার দরজা সাময়িকভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চাপের কৌশল নিলেও অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত সামরিক প্রত্যাহারের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না। সূত্র: সিএনএন