ট্রাম্পের অভিবাসী নির্বাসন অভিযানে বেআইনি বহিষ্কার বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যাপক অভিবাসী নির্বাসন অভিযানের মধ্যে বেআইনিভাবে মানুষকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে। এমন অনেক ঘটনায় আদালত হস্তক্ষেপ করছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগও বেশ কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের ভুল স্বীকার করেছে।

এরই মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি জোসে ওহেদা দুয়ার্তের। তাঁর স্ত্রী বুঝতে পারেন, কিছু একটা গুরুতরভাবে ভুল হয়েছে। আইসিইর (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) বন্দী খোঁজার অনলাইন ব্যবস্থায় স্বামীর নাম খুঁজে তিনি দেখেন, ওহেদা আর সেখানে নেই।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে রাত ৩টার দিকে আইসিই কর্মকর্তারা তাঁকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যান। ওহেদা পরে পলিটিকোকে বলেন, কর্মকর্তারা তাঁকে বলেছিলেন, ‘চলুন, আপনাকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে।’

কিন্তু আদালতে নেওয়ার বদলে তাঁকে অ্যারিজোনায় নিয়ে গিয়ে ভেনেজুয়েলায় ফেরত পাঠানো হয়। ওহেদার ভাষায়, ‘মিথ্যাবাদী। তারা আমাকে অ্যারিজোনায় নিয়ে যাচ্ছিল, যাতে ভেনেজুয়েলায় পাঠাতে পারে।’

ওহেদা চারটি বন্দিশিবিরে মোট সাত মাস আটক ছিলেন। পরে তাঁকে ভেনেজুয়েলায় পাঠানো হয়। মাদুরো সরকারের অধীনে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার পর তিনি ওই দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদন তখনও বিচারাধীন ছিল এবং তাঁকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত আদেশও ছিল না।

পরে ট্রাম্প প্রশাসন আদালতে স্বীকার করে, ওহেদাকে নির্বাসিত করা উচিত ছিল না। প্রশাসন ঘটনাটিকে ‘ডেটা কোয়ালিটি ইস্যু’ বা তথ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যার ফল বলে ব্যাখ্যা করে।

একসময় এ ধরনের বেআইনি নির্বাসন ছিল অত্যন্ত বিরল। কিন্তু ট্রাম্পের ব্যাপক নির্বাসন কর্মসূচির সময় তা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এতে নির্বাসনের মুখে থাকা অভিবাসীদের ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া পাওয়ার অধিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে।

গত বছর থেকে বিভিন্ন মামলায় বিচারকেরা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ১৭০ জনের বেশি মানুষকে আদালতের আদেশ অমান্য করে, আইনে নির্ধারিত যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে অথবা এমন দেশে পাঠিয়েছে, যেখান থেকে ওই ব্যক্তিরা নির্যাতন বা নিপীড়নের আশঙ্কায় সুরক্ষা চেয়েছিলেন কিংবা সুরক্ষা পেয়েছিলেন।

এর বেশির ভাগ ঘটনা গত বছরের একটি বিশেষ অভিযানের সময় ঘটেছিল। তবে এরপরও পলিটিকো প্রায় ৩০টি পৃথক বেআইনি নির্বাসনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহেই অন্তত তিনটি ঘটনা ঘটেছে।

বেশির ভাগ মামলায় বিচারকেরা প্রশাসনকে বেআইনিভাবে নির্বাসিত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে বলেছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) বলেছে, কোনো আদালত নির্বাসিত কাউকে দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলে নিরাপদে তাঁকে ফিরিয়ে এনে অভিবাসন-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে তারা প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়। বিভাগের এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আইনের দেশ এবং প্রশাসন আইন মেনেই চলে-যদিও তাঁদের অভিযোগ, ‘অ্যাক্টিভিস্ট বিচারকেরা’ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনকে বিকৃত করছেন।

ডিএইচএস ভুল নির্বাসন নিয়ে হওয়া মামলাগুলোর জন্য ‘র‌্যাডিক্যাল এনজিও’ ও ‘অ্যাক্টিভিস্ট বিচারকদের’ও দায়ী করেছে। তবে কেন এ ধরনের মামলা আগের তুলনায় এত বেড়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

আইসিই বন্দীদের হয়ে কাজ করা আইনজীবীদের অবশ্য কারণটি পরিষ্কার। তাঁদের মতে, দ্রুত যত বেশি সম্ভব মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ার চাপেই এসব ভুল বাড়ছে।

মেরিল্যান্ডের অভিবাসন আইনজীবী সাইমন স্যান্ডোভাল-মশেনবার্গ বলেন, ‘মেশিনটি ১১০ শতাংশ গতিতে চলছে।’ তিনি কিলমার আব্রেগো গার্সিয়ার আইনজীবী। গত বছর গার্সিয়াকে বেআইনিভাবে এল সালভাদরে পাঠানো হয়েছিল। এর আগে একজন অভিবাসন বিচারক বলেছিলেন, দেশটিতে একটি বিপজ্জনক গ্যাংয়ের হাতে তাঁর আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্যান্ডোভাল-মশেনবার্গ জানান, ২০২৫ সালের আগে তাঁর ১৭ বছরের আইনজীবী জীবনে বেআইনি নির্বাসনের মাত্র তিনটি মামলা তিনি সামলেছিলেন। এখন তাঁর প্রতিষ্ঠানেই মাসে প্রায় তিনটি এমন মামলা আসছে। পরিস্থিতি সামলাতে প্রতিষ্ঠানটি বেআইনিভাবে নির্বাসিত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার জন্য আলাদা একটি আইনি বিভাগও চালু করেছে।

অন্য আইনজীবীদের ভাষ্য, ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুততম সময়ে যত বেশি মানুষকে সম্ভব নির্বাসিত করতে গিয়ে অভিবাসন ও বিচারব্যবস্থার ওপর এমন চাপ তৈরি করেছে যে তাতে ভুল, অসতর্কতা এবং কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি আদালতের নির্দেশ অমান্যের ঘটনাও ঘটছে।

আইনজীবী হাভিয়ের রিভেরা বলেন, ‘তারা মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দিতে এতটাই তাড়াহুড়ো করছে যে, এসব কাজ আইনসম্মত কি না, সেটিও তারা ঠিকমতো দেখছে না।’

রিভেরার এক মক্কেলকে গত মাসে নিকারাগুয়ায় পাঠানো হয়। ওই নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়ায় তাঁকে নির্বাসন থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। পরে এক ফেডারেল বিচারক তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন।

একই দিন আরেক ফেডারেল বিচারক এস্তেবান রিওস সোসাকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরানোর নির্দেশ দেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্প পেন্ডলটনে গর্ভবতী মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দ্রুত মেক্সিকোয় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

রিওস সোসা ১৯৮৮ সাল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার ওশানসাইডে বসবাস করছিলেন। তাঁর দুই সন্তানই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক; তাঁদের একজন মেরিন কোরে কাজ করেছেন। তাঁর তিন নাতি-নাতনিও মার্কিন নাগরিক। এ ছাড়া তাঁকে আটক করার সময় তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাসন ঠেকাতে ‘ডিফার্ড অ্যাকশন’ নামের একটি সক্রিয় সুরক্ষা ছিল।

রিওস সোসার আইনজীবী মোনিকা ল্যাঙ্গারিকা বলেন, ‘মি. রিওস সোসার মতো মানুষদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সরকার আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এই প্রশাসন তা থেকে সরে এসেছে।’

ট্রাম্প প্রশাসন আবার বলছে, প্রেসিডেন্টের ব্যাপক নির্বাসন কর্মসূচির কারণে অভিবাসনসংক্রান্ত মামলার ‘নজিরবিহীন চাপ’ও ভুল নির্বাসনের অন্যতম কারণ।

বিচার বিভাগ ও আইসিই বিভিন্ন মামলায় প্রায়ই নিজেদের ভুল আদালতে স্বীকার করেছে। তাদের ব্যাখ্যায় এসব ঘটনা প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। যেমন, কলেজছাত্রী অ্যানি লোপেজ বেলোজাকে গত বছর আদালতের আদেশ অমান্য করে হন্ডুরাসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ম্যাসাচুসেটসের এক আইসিই কর্মকর্তা পরে জানান, তিনি ভুল করে ভেবেছিলেন, লোপেজ বেলোজাকে সুরক্ষা দেওয়া আদালতের আদেশ সম্পর্কে অন্য অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তাদের জানানো তাঁর প্রয়োজন নেই।

এ ধরনের আরও কয়েকটি ঘটনায় আইসিই প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সমস্যাকে দায়ী করেছে। কোথাও বন্দীর অভিবাসন নথিতে ভুল তথ্য লেখা ছিল, কোথাও আদালতের আদেশ নির্বাসন কার্যক্রম পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছায়নি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাসন ঠেকানো আদালতের আদেশই বন্দীর নথি থেকে বাদ পড়ে যায়। এসব ভুল যেন আবার না ঘটে, সে জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা হালনাগাদ করার কথা বিচারকদের জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের বিচারকেরাও ভুলভাবে নির্বাসিত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজন ছিলেন ট্রাম্পের নিয়োগ করা বিচারক।

কিছু মামলায় প্রশাসন ভুল সংশোধনে কাজ করেছে। আবার অন্য কিছু মামলায় তারা আপত্তি জানিয়েছে। কোথাও প্রশাসনের যুক্তি ছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আর যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে না থাকায় আটকসংক্রান্ত মামলা কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে। আবার কোথাও বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনলে সংবেদনশীল কূটনৈতিক সম্পর্কে হস্তক্ষেপ হতে পারে।

ইউটাহর ফেডারেল জেলা বিচারক জিল প্যারিশ ফেব্রুয়ারির এক আদেশে ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেন, প্রশাসন ‘আগে নির্বাসন, পরে মামলা’ নীতি অনুসরণ করতে পারে না।

ওই মামলায় ডিএইচএস পাল্টা যুক্তি দেয়, বিচারক প্যারিশ ওবামার নিয়োগপ্রাপ্ত। বিভাগটি আরও জানায়, যাঁকে নির্বাসিত করা হয়েছিল, তাঁর মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তারের ইতিহাস রয়েছে এবং তাঁকে এর আগেও একাধিকবার নির্বাসিত করা হয়েছিল।

কিলমার আব্রেগো গার্সিয়া ও লোপেজ বেলোজার মতো কিছু ঘটনা জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনায় এলেও অধিকাংশ ঘটনা খুব বেশি প্রচার ছাড়াই আদালতের নথিতে আটকে আছে।

এর মধ্যে ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির ঘটনাও রয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, তাঁর মানসিক সক্ষমতা ছিল চার বছরের শিশুর মতো। গত গ্রীষ্মে আইসিই তাঁকে আটক করে কোনো নোটিশ না দিয়েই মেক্সিকোয় পাঠিয়ে দেয়। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে তখন কোনো নির্বাসন কার্যক্রমই চলছিল না। পরে জানা যায়, তিনি একটি ‘স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ’ ফরমে স্বাক্ষর করেছিলেন।

চলতি বসন্তে ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরানোর চেষ্টা করে। তবে জানায়, ফেরার পর তাঁকে আইসিই হেফাজতে রাখা হবে। বিচারক তাঁর অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দেন। আদালত ঘটনাটিকে ‘ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার গুরুতর অভাব’ বলে উল্লেখ করে এবং তাঁর প্রতিবন্ধকতার কারণে বিশেষ ধরনের মানসিক ও আবেগগত ক্ষতির আশঙ্কার কথাও জানায়।

আরেক ঘটনায় ১৯৯৮ সালে ১৫ বছর বয়সে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা এক ডিএসিএ সুবিধাভোগী নারীকে নির্বাসিত করা হয়। বর্তমানে তিনি ২২ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিক মেয়ের মা।

আইনি বৈধতা পাওয়ার জন্য একটি শুনানিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রে আসার মাত্র কিছুদিন পর, ২৭ বছর আগে তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাসনের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। পরদিন সকালেই তাঁকে মেক্সিকোয় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মার্কিন জেলা বিচারক ডেনা কগিন্স বলেন, সক্রিয় ডিএসিএ সুবিধাভোগী একজনকে নির্বাসিত করা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন। বিচারক লিখেছেন, ‘প্রতিদিন আবেদনকারী তাঁর মেয়ের কাছ থেকে বেআইনিভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় দুজনই কল্পনাতীত অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।’

ডিএইচএস বিচারক কগিন্সকে ‘বাইডেনের নিয়োগ করা অ্যাক্টিভিস্ট বিচারক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, ডিএসিএ যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ধরনের বৈধ অভিবাসন মর্যাদা দেয় না। তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন কারণে ডিএসিএ সুবিধাভোগীরাও গ্রেপ্তার ও নির্বাসনের মুখে পড়তে পারেন।

আরেক ঘটনায় ১২ বছর বয়সী দুই যমজ মার্কিন নাগরিক শিশুকে গুয়াতেমালায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আইসিইতে মায়ের নিয়মিত হাজিরার সময় তারা তাঁর সঙ্গে গিয়েছিল। মাকে যথাযথভাবে নির্বাসিত করা হলেও তিনি সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রে দাদির কাছে রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্তানদেরও গুয়াতেমালায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে এক বিচারক তাঁদের দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা কার্যকর করে। বিচারক শিশু দুটিকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের ‘সৎ প্রচেষ্টার’ প্রশংসাও করেন।

মিনেসোটায় আরেক মেক্সিকান নাগরিককে ওয়ালমার্ট থেকে আইসিই আটক করে। কোনো অপরাধের রেকর্ড ছাড়াই ওই ব্যক্তি ২৬ বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছিলেন। আটকের পর তাঁকে দ্রুত এল পাসোয় নিয়ে যাওয়া হয়।

এক ফেডারেল বিচারক তাঁকে মিনেসোটায় ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেও আইসিই তাতে আপত্তি জানায়। কয়েক দিন পর তাঁকে বাসে করে মেক্সিকো সীমান্তে নিয়ে গিয়ে নির্বাসিত করা হয়। প্রশাসনের দাবি ছিল, ওই ব্যক্তি স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে জেলা বিচারক জেফরি ব্রায়ান বলেন, চুক্তিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং এটি আদালতের আদেশকে অগ্রাহ্য করতে পারে না।

দেশে ফিরেও অনিশ্চয়তা

জোসে ওহেদার যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। ১৫ এপ্রিল এক ফেডারেল বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনকে তাঁকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে বলেন। ১ জুন তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হয়।

এর চার দিন পর একই বিচারক আইসিইকে অভিবাসন আদালতে তাঁর জামিন শুনানির ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। ১২ জুনের মধ্যে ওহেদা জামিনে মুক্তি পান। নয় মাস পর তিনি পরিবারের কাছে ফিরে যান।

ওহেদা বলেন, তাঁর স্ত্রী তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ‘আকাশ-পাতাল এক করে’ চেষ্টা করেছেন। দুই সন্তানকে দেখাশোনা করার পাশাপাশি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী স্বামী ছাড়া কোনো আয় না থাকলেও তিনি সেই লড়াই চালিয়ে গেছেন।

তবে আদালতে নিজের ভুল স্বীকার করলেও ডিএইচএস পলিটিকোকে বলেছে, ওহেদাকে কেবল ‘কারাকাসে বাড়ি পাঠানো’ হয়েছিল। তাঁকে ফেরানোর আদেশকে তারা ‘ওবামার আমলে নিয়োগ পাওয়া একজন বিচারকের’ সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ডিএইচএসের মুখপাত্র বলেন, ওহেদা পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া পাবেন। তাঁর ভাষ্য, আদালতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার সংখ্যা ঐতিহাসিক পর্যায়ে পৌঁছালেও ডিএইচএস দ্রুত কাজ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তাঘাট থেকে এ ধরনের অভিবাসীদের সরিয়ে তাঁদের চূড়ান্ত গন্তব্য-‘বাড়িতে’ পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আদালতের নির্দেশে আরও কয়েকজন আইসিই নির্বাসিতকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ওহেদার মতো তাঁদের বেশির ভাগেরই অভিবাসন মামলা এখনো চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকার অনুমতি পাওয়ার পথও তাঁদের জন্য দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত।

কিলমার আব্রেগো গার্সিয়ার মামলাটি দেখভাল করা জেলা বিচারক পলা জিনিসও গত গ্রীষ্মে প্রশাসনের আচরণে কিছুটা পরিবর্তন দেখেছেন। এর আগে এক ব্যক্তিকে নির্বাসিত করা হয়েছিল, যিনি শিশু বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন এবং নির্যাতনকারী বাবার কারণে নির্বাসন থেকে সুরক্ষা পেয়েছিলেন।

বিচারক জিনিস ১৭ জুন তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। ৫ জুলাই বিচার বিভাগ আদালতকে জানায়, ১৯ বছর বয়সী ওই তরুণ ‘বাড়ি ফিরে খুশি’ এবং বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞ।

তবে সবাই ফিরতে রাজি নন। লোপেজ বেলোজাসহ অন্তত দুজন আইসিইর দেশে ফেরানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে ফিরলেই আবার আটক করা হতে পারে এবং মাসের পর মাস অভিবাসন বন্দিশিবিরে থাকতে হতে পারে। শেষ পর্যন্ত আবারও তাঁদের নির্বাসিত করা হতে পারে-এই ভয়ও রয়েছে।

আরও কিছু মানুষ গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পরই আটক হয়েছেন। তাঁদের আইনজীবীরা অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের পক্ষেও তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

স্যান্ডোভাল-মশেনবার্গ জানান, তাঁর দুজন মক্কেল এখনো এল সালভাদরে আটক। স্থানীয় কোনো আইনজীবী আগে তাঁদের সালভাদরের হেফাজত থেকে মুক্ত করতে না পারলে তাঁদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি খুব বেশি আশাবাদী নন।

যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এলেও ওহেদার নিজের জীবন এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। নির্বাসনের আশঙ্কা প্রতিদিনই তাঁর সঙ্গে আছে।

তিনি বলেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রে একজন শ্রমিক। আমি সৎ ও দায়িত্বশীল। ফিরে এসে আমি খুব খুশি-পরিবারের সঙ্গে আছি, ভালোভাবে খাচ্ছি, সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি এবং পরিবারকে সাহায্য করছি। এখন আমার লক্ষ্য বৈধ মর্যাদা পাওয়া।’

সূত্র: পলিটিকো