যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নানটাকেট দ্বীপের উপকূলের কাছে বারমুডা থেকে বোস্টনের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি মেডিকেল এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নিখোঁজ হওয়ার পর তল্লাশি অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। মার্কিন কোস্টগার্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ Gulfstream G100 উড়োজাহাজটির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধ্বংসাবশেষের এলাকা (debris field) সমুদ্রে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে বিমানটির ছয় আরোহীর কাউকে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বিমানটিতে ছিলেন চারজন ক্রু ও দুই যাত্রী। কানাডার পরিবহনমন্ত্রী স্টিভেন ম্যাককিনন জানিয়েছেন, চারজন কানাডীয় নাগরিক ছিলেন। অপর দুইজন ছিলেন বারমুডার নাগরিক। যাত্রী দুজনের মধ্যে একজন রোগী এবং অন্যজন তার পরিবারের সদস্য ছিলেন।
কানাডায় নিবন্ধিত বিমানটি Latitude Air Ambulance পরিচালনা করছিল। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকভাবে রোগী ও তাদের স্বজনদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরিবহন এবং মেডিকেল ইভাকুয়েশন পরিচালনা করে।
বারমুডার এলএফ ওয়েড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানটি শনিবার ভোররাত ১২টা ৪১ মিনিটের দিকে বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করে। প্রায় ৮০০ মাইলের এই যাত্রায় বিমানটির বোস্টনে স্থানীয় সময় রাত দেড়টার দিকে অবতরণের কথা ছিল।
কিন্তু গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগে বিমানটির সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১টা ২০ মিনিটে বিমানটির জন্য সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অ্যালার্ট জারি করে এবং পরে কোস্টগার্ডকে বিষয়টি জানানো হয়।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি যাত্রার বড় একটি অংশ প্রায় ২৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কিছুক্ষণ আগে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এটি প্রায় ১৩ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়। এরপর বিমানটি কিছু সময় অপেক্ষাকৃত নিচু উচ্চতায় অবস্থান করলেও শেষ পর্যন্ত রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়।
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের রেডিও যোগাযোগের রেকর্ডেও পরিস্থিতির গুরুতর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একজন কন্ট্রোলারকে পাইলটকে উদ্দেশ করে বলতে শোনা যায়, “আপনি কি বলছেন যে আপনি সামনে দেখতে পাচ্ছেন না?” এরপর কন্ট্রোলার জানতে চান, বিমানটি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছে কি না। পরে পাইলট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন বলে নিশ্চিত করা হয়।
রেডিও যোগাযোগের সময় বিমানটির পাইলট দুর্বলভাবে কথা বলছিলেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বোস্টন লোগান বিমানবন্দরের জরুরি বিভাগের কর্মীদেরও বিমানটির সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক সমস্যার বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। বিমানটির রেডিও ও রাডার যোগাযোগ দুটিই হারিয়ে যায়।
ঘটনার সময় ওই অঞ্চলে আবহাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এয়ার ট্রাফিক অডিওতে ঝড়ের সামনে বিমানটি ‘blind’ অবস্থায় পড়েছিল কি না, তা নিয়ে কথোপকথন শোনা যায়। তবে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে এখনো কোনো বিষয়কে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেনি কর্তৃপক্ষ।
বিমান নিখোঁজ হওয়ার পর নানটাকেটের দক্ষিণে সমুদ্র এলাকায় ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু করে মার্কিন কোস্টগার্ড। অভিযানে HC-144 Ocean Sentry, HC-130 Hercules, MH-60 Jayhawk হেলিকপ্টার, একটি ৪৭ ফুটের মোটর লাইফবোট এবং USCGC William Sparling কোস্টগার্ড কাটারসহ একাধিক আকাশ ও নৌযান অংশ নেয়।
কোস্টগার্ড জানিয়েছে, প্রায় ২৭ ঘণ্টার অভিযানে ১,৬০০ বর্গমাইলের বেশি এলাকা তল্লাশি করা হয়েছে। এরপর নানটাকেটের উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রে বিমানটির সঙ্গে সম্পর্কিত ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত হয়।
ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত হওয়ার পরও উদ্ধার অভিযান বন্ধ হয়নি। বরং পানিতে থাকা সম্ভাব্য আরোহীদের সন্ধানে রাতভর তল্লাশি চালানোর জন্য কোস্টগার্ডের একটি কাটারকে এলাকায় রাখা হয়েছে। নিখোঁজদের স্বজনদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
অন্টারিওভিত্তিক Latitude Air Ambulance জানিয়েছে, তাদের বিমানটি রোগী পরিবহনের জন্য বারমুডায় গিয়েছিল। কোম্পানির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি প্রতিষ্ঠানটির কোনো বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর প্রথম ঘটনা।
প্রতিষ্ঠানটির বহরে Gulfstream G100 বিমান রয়েছে এবং এগুলো মেডিকেল ইভাকুয়েশনের জন্য বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত এসব বিমানে দুই পাইলটের পাশাপাশি মেডিকেল কর্মী এবং রোগী পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকে।
বিমানটির ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত হওয়া দুর্ঘটনার অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিলেও দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। বৈদ্যুতিক ত্রুটি, আকস্মিক উচ্চতা কমে যাওয়া, আবহাওয়ার পরিস্থিতি কিংবা এসবের সমন্বিত কোনো কারণ ছিল কি না—তা এখনো তদন্তাধীন।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি কানাডার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কানাডার পরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা কাজ করছেন। এদিকে বারমুডা সরকারও নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ধ্বংসাবশেষের অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর ছয় আরোহীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় কি না। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, আরোহীদের সন্ধানে সমুদ্র ও আকাশপথে অভিযান অব্যাহত থাকবে।