গণহত্যার অন্যতম কেন্দ্র গোহারদাশত কারাগার গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইরান

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৪ এএম

১৯৮৮ সালে রাজনৈতিক বন্দিদের গণহত্যার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ইরানের রাজাই শাহর বা গোহারদাশত কারাগারের অবশিষ্ট স্থাপনাগুলোও ধীরে ধীরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। শনিবার কারাগারটির শেষ দিকের একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও ভেঙে ফেলা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের সতর্কতা ছিল—কারাগারটি পুরোপুরি ধ্বংস করা হলে অতীতের মৃত্যুদণ্ড ও নির্যাতনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হারিয়ে যেতে পারে।

কারাগারটি রাজধানী তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে অবস্থিত। ১৯৮৮ সালের রাজনৈতিক বন্দিদের গণহত্যার সময় এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র ছিল বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডে ইরানজুড়ে ঠিক কতজন নিহত হয়েছিলেন, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে অধিকারকর্মীদের বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৫ হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

২০২৩ সালের আগস্টে রাজাই শাহর কারাগার খালি করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই এর বিভিন্ন অংশ ভাঙার কাজ চলছিল। ইরানি কর্তৃপক্ষ কারাগারটি বন্ধ করার কারণ হিসেবে শহরের বাইরে কারাগার স্থানান্তরের আইন, কারাগারকেন্দ্রিক যানজট এবং বন্দিদের স্বজনদের যাতায়াতজনিত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে।

ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই ২০২৩ সালের এপ্রিলে কারাগারটি বন্ধের নির্দেশ দেন। সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের মধ্যে কারাগারটি পুরোপুরি খালি করা হয় এবং বন্দিদের কাছাকাছি ঘেজেল হেসার কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

কারাগারের বাইরের দেয়াল ভাঙার কাজ ২০২৬ সালের মার্চের দিকে শুরু হয় এবং সেপ্টেম্বরে তা আরও জোরদার করা হয়। এরপর শনিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও ধ্বংস করা হয়।

নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন Iran Human Rights কারাগারটি বন্ধের সময়ই এর ধ্বংস ঠেকাতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।

সংগঠনটির পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম ২০২৩ সালে বলেছিলেন, গোহারদাশত কারাগারে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং এসব অপরাধের পূর্ণ চিত্র এখনো জানা যায়নি। তার মতে, কারাগারটি ধ্বংস করা হলে এসব অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হারিয়ে যেতে পারে।

সংগঠনটি দাবি করেছে, কারাগারটি বন্ধ ও ধ্বংসের প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। তবে এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

১৯৮৮ সালের হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি পরবর্তী কয়েক দশকেও রাজাই শাহর কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। Iran Human Rights-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, শুধু হত্যা মামলায় ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সেখানে অন্তত ৫৩০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।

রাজাই শাহর কারাগারটি ১৯৮৮ সালের গণহত্যার দায়বদ্ধতা নির্ধারণের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাবেক কারা কর্মকর্তা হামিদ নুরির বিরুদ্ধে সুইডেনে দায়ের করা মামলায় কারাগারটির নাম বারবার উঠে আসে।

সুইডেনের একটি আদালত ২০২২ সালে ১৯৮৮ সালের রাজনৈতিক বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় ভূমিকার জন্য নুরিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। আপিলেও সেই রায় বহাল ছিল। পরে ২০২৪ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে বন্দিবিনিময়ের অংশ হিসেবে সুইডেন তাকে মুক্তি দেয়।

ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য কারাগার ধ্বংসকে ঐতিহাসিক প্রমাণ মুছে ফেলার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরছে না। বরং প্রায় ৬০ হেক্টর জায়গাটিতে নতুন নগর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে তারা।

পরিকল্পনায় রয়েছে সবুজ এলাকা, নারীদের জন্য পার্ক, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, মিলনায়তন ও আর্ট গ্যালারি। কারাগারের মূল ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা হবে বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় ঘরানার একটি সংবাদমাধ্যম শনিবার পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ভেঙে পড়ার ঘটনাকে কারাজ শহরের পরিচিত একটি স্থাপনার বিলুপ্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে প্রতিবেদনে ১৯৮৮ সালের গণহত্যায় কারাগারটির ভূমিকা কিংবা প্রমাণ সংরক্ষণের বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কতার কথা উল্লেখ করা হয়নি।

রাজাই শাহর কারাগার ধ্বংসের বিষয়টি ইরানের ১৯৮৮ সালের গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্মৃতি ও সমাধিস্থল সংরক্ষণের প্রশ্নটিকেও সামনে এনেছে।

Iran Human Rights-এর মতে, তেহরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের খাভারান কবরস্থানে ওই সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বহু রাজনৈতিক বন্দিকে নাম-পরিচয়বিহীন গণকবরে দাফন করা হয়েছিল। কবরস্থানটির পরিবর্তন বা ধ্বংসের আশঙ্কা নিয়ে ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের কাছে হস্তক্ষেপের আবেদনও জানিয়েছিল।

ফলে রাজাই শাহর কারাগার ধ্বংসের ঘটনা শুধু একটি পুরোনো কারাগার সরিয়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণের বিষয় নয়; এটি ১৯৮৮ সালের হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি, ঐতিহাসিক প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতে দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

কারাগারের জায়গায় পার্ক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও অতীতের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি, স্থাপনা ও অন্যান্য সম্ভাব্য প্রমাণ কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যবস্থা প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত