রাশিয়ার একটি প্লেগ গবেষণাগারে কর্মরত এক কর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় মস্কোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় চাপ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য প্লেগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে গিয়ে রুশ কর্তৃপক্ষের তথ্য গোপনীয়তা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ইরকুতস্কের সাইবেরিয়া অ্যান্টি-প্লেগ গবেষণা ইনস্টিটিউটে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী ওই কর্মীর মৃত্যুর পরপরই বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে উদ্বেগ তৈরি হয়। একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং পরিস্থিতি মূল্যায়নে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা কাজ শুরু করে। তবে রাশিয়ার কাছ থেকে সীমিত তথ্য পাওয়ায় এই প্রচেষ্টা জটিল হয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) রাতে রুশ সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়ে ঘটনার বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, রুশ সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও তথ্য চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও তথ্য বিনিময়ের জন্য যোগাযোগ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, রাশিয়ার উচিত বিষয়টি নিয়ে বিশ্বের সঙ্গে আরও তথ্য ভাগ করে নেওয়া। তবে সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বা অনুমাননির্ভর বক্তব্য দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
মার্কিন কর্মকর্তারা গত শুক্রবার থেকেই রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। এ যোগাযোগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও যুক্ত ছিলেন। মঙ্গলবার পর্যন্তও সেই যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। রুবিও আশা প্রকাশ করেন, আগামী কয়েক ঘণ্টা বা দিনের মধ্যে তথ্য ভাগাভাগির ক্ষেত্রে রাশিয়ার অবস্থানের পরিবর্তন হতে পারে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, বিষয়টি নিয়ে খুব শিগগিরই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা বলার কথা রয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, পরদিন এ বিষয়ে মার্কিন সংস্থাগুলোর কাছে আরও তথ্য থাকতে পারে। তবে বুধবার ক্রেমলিন জানায়, প্লেগ-সংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে কোনো ফোনালাপ নির্ধারিত হয়নি।
এখন পর্যন্ত রাশিয়ার কাছ থেকে সীমিত সহযোগিতা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া থেকে প্রকাশিত সামান্য তথ্য নিয়েও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, মস্কো ঘটনাটির বিষয়ে পুরোপুরি তথ্য দিচ্ছে না।
তবে পরিস্থিতি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরও নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কোনো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা সম্ভাব্য সংক্রমণ ঠেকাতে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যদিও বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই নাগরিকদের রাশিয়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়ে আসছে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গত সপ্তাহে মারা যাওয়া ২৮ বছর বয়সী ওই গবেষণাগারকর্মী সত্যিই নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি না। নিউমোনিক প্লেগ গুরুতর হলেও অ্যান্টিবায়োটিকে চিকিৎসাযোগ্য। তবে ওই কর্মীর মৃত্যু অন্য কোনো অজানা সংক্রামক রোগের কারণেও হয়ে থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট গবেষণাগারে প্লেগের পাশাপাশি কলেরা, অ্যানথ্রাক্স ও ব্রুসেলোসিসের মতো অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ রোগ নিয়েও গবেষণা করা হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা আরও জানতে চাইছেন, ওই রোগজীবাণু কোনোভাবে পরিবর্তিত করা হয়েছিল কি না। গবেষণাগারে কোনো জীবাণুর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের এমন প্রক্রিয়াকে গেইন অব ফাংশন বলা হয়। এমন কিছু হয়ে থাকলে সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়ার ধরনও ব্যাপকভাবে বদলে যেতে পারে।
প্রকাশ্যে মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য সাধারণ আমেরিকানদের জন্য তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কম বলে উল্লেখ করেছেন। রুবিওসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন এবং বলেছেন, নিউমোনিক প্লেগ অ্যান্টিবায়োটিকে চিকিৎসাযোগ্য। কিন্তু প্রশাসনের ভেতরে রাশিয়ার কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষের নেওয়া কিছু পদক্ষেপ। শেলেখোভস্কি জেলার মেয়রের ভাষ্য অনুযায়ী, যে হাসপাতালে ওই গবেষণাগারকর্মীর চিকিৎসা হয়েছিল সেটি কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। একটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রায় ২০০ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
তবে রাশিয়ায় দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি একই ধরনের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন, এমন খবর এখনো নিশ্চিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস জানান, রুশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে, ইরকুতস্ক অঞ্চলে সম্প্রতি প্লেগের কোনো ঘটনা নিবন্ধিত হয়নি। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে পরীক্ষা ও চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে উচ্চঝুঁকির কোনো রোগজীবাণু পাওয়া যায়নি।
তেদ্রোস আরও জানান, অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত দ্বিতীয় এক কর্মীকে নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তবে ক্রেমলিন ওই প্রতিবেদনকে গুরুত্ব না দিয়ে সাংবাদিকদের জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেওয়া তথ্যের দিকে নজর দিতে বলেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম ও স্থানীয় কর্মকর্তারাও এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউমোনিক প্লেগ দ্রুত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা করোনাভাইরাসের মতো নয়। ইরকুতস্কের গবেষণাগারটির তুলনামূলক দুর্গম অবস্থানও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। তবে চিকিৎসা না হলে প্লেগ প্রাণঘাতী হতে পারে। বর্তমানে এ রোগের চিকিৎসায় কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকও সহজলভ্য।
তারপরও ঘটনাটি সম্ভাব্য জৈবিক হুমকি পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, পরিস্থিতি বোঝা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র এবং কৌশলগত প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া প্রশাসনের মতো মার্কিন স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও এই প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গেও পর্দার আড়ালে যোগাযোগ করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন সংস্থাটির অর্থায়ন থেকে সরে গেছে। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রচলিত নিউমোনিক প্লেগ মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মজুতভাণ্ডারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু রোগজীবাণু পরিবর্তিত হয়ে থাকলে সেই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে বা নতুন চিকিৎসা তৈরি করতে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জেনিফার নুজ্জো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য মোকাবিলা ব্যবস্থার সক্ষমতা অর্থসংকট ও বিভিন্ন সংকট মোকাবিলার চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, এর মধ্যে নতুন কোনো রোগজীবাণুর আবির্ভাব ঘটলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উতে পারে। সূত্র: সিএনএন