যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট গণনা ও ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিক ফলাফলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এখনো কোনো কক্ষের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়নি।
নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটি এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট হয়েছে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের কাছেই এবারের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ পাবে ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়বে। অন্যদিকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে পারে।
নির্বাচনে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। মূল্যস্ফীতি, আমদানি শুল্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। গত বছর ক্ষমতায় ফেরার আগে দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধও ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত একাধিক জরিপেও অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনসমর্থন নিয়েও চাপের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে ভোটের ফলই শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে মার্কিন ভোটারদের মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরবে।
নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সিনেট আসনটি ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার। জর্জিয়ায় জন অসফ এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারে ক্রিস পাপাসও জয় পেয়েছেন।
তবে সিনেটের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে আরও কয়েকটি আসনের ফলের অপেক্ষা রয়েছে। ফলে প্রাথমিক সাফল্য সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটরা এখনই সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।
আলজাজিরার লাইভ স্কোরবোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ৭৭টি আসনে জয় পেয়েছে এবং আরও ১২১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ৪০টি আসনে জয় পেয়েছে এবং ৮২টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এখনো ১১৫টি আসনের ফল অপেক্ষমাণ।
এ হিসাবে এগিয়ে থাকা আসনগুলো ধরে রাখতে পারলে ডেমোক্র্যাটদের মোট আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১৯৮টি এবং রিপাবলিকানদের ১২২টি। তবে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য আরও আসনে জয় নিশ্চিত করতে হবে।
আলজাজিরার স্কোরবোর্ডে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ৪৫ এবং রিপাবলিকানদের ৩৫ দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া ডেমোক্র্যাটরা আরও সাতটি আসনে এবং রিপাবলিকানরা আটটি আসনে এগিয়ে রয়েছে। চারটি আসনের ফল এখনো অপেক্ষমাণ।
স্কোরবোর্ডের নিচের নোটে উল্লেখ করা হয়েছে, সিনেটের মোট আসনসংখ্যার হিসাবে এ বছর নির্বাচনে অংশ না নেওয়া ডেমোক্র্যাট-ঘনিষ্ঠ ৩৪টি এবং রিপাবলিকানদের ৩১টি আসনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাই ৪৫ ও ৩৫ আসনের হিসাবকে শুধু এবারের নির্বাচনে পাওয়া আসন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৫১টি আসন। ডেমোক্র্যাটদের বর্তমান আসনসংখ্যার সঙ্গে এগিয়ে থাকা সাতটি আসন যোগ হলে সংখ্যাটি ৫২-তে পৌঁছাতে পারে। তবে এগিয়ে থাকা আসনগুলোতে জয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কংগ্রেসীয় তদন্ত ও নজরদারি বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণও বদলে গেলে বিচারপতি ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
সব মিলিয়ে, আলজাজিরার লাইভ স্কোরবোর্ডে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। তবে ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এবারের নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক কৌশলের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।