ইউক্রেনীয় যুদ্ধবন্দিদের ওপর পরিকল্পিতভাবে যৌন সহিংসতা চালিয়ে সেটিকে ‘যুদ্ধের অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগীদের দাবি, রুশ বাহিনী ধর্ষণ ও যৌনাঙ্গ বিকৃতির মতো নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের অপমানিত ও মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতে চেয়েছে।
এমন তথ্য উঠে এসেছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনটি জীবিত ফিরে আসা বন্দিদের সাক্ষাৎকার, ইউক্রেনের প্রসিকিউটর এবং জাতিসংঘের তদন্তকারীদের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রুশ বাহিনী বিশেষ করে ইউক্রেনের পুরুষ যুদ্ধবন্দিদের ওপর পদ্ধতিগতভাবে যৌন নির্যাতন চালিয়ে আসছে।
ইউক্রেনের সাবেক বন্দি সেরহি বোইচুক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানান, ২০২২ সালে তিনি রুশ বাহিনীর হাতে বন্দি হন। পরবর্তী দুই বছর আটক কেন্দ্রে তাকে মারধরের পাশাপাশি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
বর্তমানে ৩৩ বছর বয়সী বোইচুক বলেন, “তারা আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতে চেয়েছিল।” তিনি জানান, তাকে বোতল ও লাঠি দিয়ে ধর্ষণ করা হয় এবং তার যৌনাঙ্গে ছুরি ঠেকিয়ে ভয় দেখানো হয়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া বোইচুক বলেন, “তারা মানুষকে অপমানিত ও মানসিকভাবে ধ্বংস করার জন্য যৌন নির্যাতনকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।”
আরও এক সাবেক ইউক্রেনীয় যুদ্ধবন্দিও রাশিয়ার যুদ্ধবন্দি শিবিরে একই ধরনের যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানান।
ভুক্তভোগীদের এসব বক্তব্য ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এবং জাতিসংঘের তদন্তকারীদের অনুসন্ধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চার বছরের বেশি সময় ধরে তারা সাবেক বন্দিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে যে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, তাতে দেখা যায় যুদ্ধবন্দি ও বেসামরিক বন্দিদের বিরুদ্ধে রুশ বাহিনীর যৌন সহিংসতা ছিল পরিকল্পিত এবং অনেক ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন রুশ কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়প্রাপ্ত।
যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের বেসামরিক জনগণকে দমন ও আতঙ্কিত করতে যৌন সহিংসতা বহুদিন ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর শিকার হন নারী ও শিশুরা।
জাতিসংঘ এবং দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুর দিকে রুশ বাহিনী দখল করা শহর ও গ্রামগুলোতে নারীদেরও যৌন সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পর বর্তমানে অধিকাংশ পরিচিত ভুক্তভোগী হচ্ছেন যুদ্ধক্ষেত্রে আটক হওয়া ইউক্রেনীয় পুরুষ সেনারা।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তাধীন যৌন সহিংসতার ৩১০টি অভিযোগের মধ্যে ২৮০ জন ভুক্তভোগী পুরুষ, ২৬ জন নারী এবং ৪ জন কন্যাশিশু।
জাতিসংঘ জানায়, অধিকাংশ ভুক্তভোগীর ওপর ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, যৌনাঙ্গ বিকৃতি, বৈদ্যুতিক শক এবং যৌনাঙ্গে মারধরের মতো নির্যাতন চালানো হয়েছে।
কয়েকজন সাবেক যুদ্ধবন্দি ও বেসামরিক বন্দি জানান, তাদের নগ্ন অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা, বসতে বাধ্য করা কিংবা প্রদর্শন করা হতো। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, তাদের যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে জানান, বোতল বা লাঠির মতো বস্তু কিংবা রুশ প্রহরীদের মাধ্যমে তাদের ধর্ষণ করা হয়েছে।
কিছু সাবেক বন্দি আরও বলেন, রুশ প্রহরীরা তাদের বলত যে তারা ইউক্রেনীয়দের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নষ্ট করে দেবে। এমনকি কারও কারও মলদ্বারে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ফোম ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়, যা পরে শক্ত হয়ে যাবে বলে ভয় দেখানো হতো।
এসব অভিযোগের বিষয়ে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে অতীতে মস্কো যৌন নির্যাতনের অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এছাড়া সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার তদন্তে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের অধিকৃত এলাকায় প্রবেশের অনুমতিও বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া।
ইউক্রেনের তদন্তকারীদের ধারণা, রুশ অধিকৃত এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর চলমান যৌন ও অন্যান্য নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। প্রতিশোধের আশঙ্কা এবং যৌন সহিংসতা নিয়ে সামাজিক কলঙ্কের কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে সাহস পান না।
ইউক্রেনের প্রসিকিউটর আন্না সোসোনস্কা বলেন, 'যৌন নির্যাতন যুদ্ধ পরিচালনার সবচেয়ে সস্তা অস্ত্রগুলোর একটি।'
তিনি জানান, ইউক্রেনের জাতীয় প্রসিকিউটর দপ্তর বর্তমানে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে রুশ সেনাদের যৌন সহিংসতার প্রায় ৪০০টি অভিযোগ তদন্ত করছে। এর মধ্যে অন্তত ১৪৮টি মামলায় ভুক্তভোগী পুরুষ।
সূত্র: এনডিটিভি