পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কন্স্যুলেট বন্ধে সময় বেঁধে দিলো ইসরায়েল

অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার যৌথ নিষেধাজ্ঞার জবাবে ব্রিটেনকে পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কন্স্যুলেট আগামী ৩০ দিনের মধ্যে বন্ধ করতে বলেছে ইসরায়েল।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ইসরায়েলের দুটি কূটনৈতিক সূত্র ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা এই সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।

পূর্ব জেরুজালেমের এই ব্রিটিশ কনস্যুলেটটি যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে জেরুজালেম, পশ্চিম তীর এবং গাজায় ফিলিস্তিন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে আসছিল।

মঙ্গলবার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার জানিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য নিয়োজিত ওই কন্স্যুলেটটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি গাজায় যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত যৌথ সমন্বয় মিশন থেকে যুক্তরাজ্যকে বাদ দেওয়া হবে। এছাড়া যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিনসহ দেশটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও নাগরিকের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন।

যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপকে ‘নৈতিকভাবে বিকৃত’ আখ্যা দিয়ে ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নগ্ন হস্তক্ষেপের শামিল।’ ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নিধন’ নিয়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের মন্তব্যকে ‘জঘন্য মিথ্যাচার’ বলেও অভিহিত করেন সার। তিনি জানান, আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে পরামর্শ করেই এসব জবাব দেওয়া হচ্ছে।

রয়টার্স লিখেছে, মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার প্রস্তাবিত ওই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা মূলত ইসরায়েলের বসতি স্থাপন নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক পদক্ষেপের অংশ, যা প্রথাগত মিত্রদের কাছে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকেই তুলে ধরছে। ওই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ‘দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের পদক্ষেপে আজ একটি নতুন মোড় নিল।’

সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে বলে জানান তারা। এছাড়া ডেনমার্ক, নরওয়ে, পোল্যান্ড, স্পেন ও সুইডেনসহ আরও নয়টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পৃথক এক বিবৃতিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিব্যান্ড বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুধু মুখে কথা না বলে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ রুখতে যুক্তরাজ্যের এখন সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন দীর্ঘমেয়াদি শান্তির লক্ষ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জাতিসংঘ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের বড় অংশ এসব বসতিকে অবৈধ মনে করলেও ইসরায়েল তা মানে না।

মঙ্গলবার রয়টার্সের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইসরায়েল সরকার পশ্চিম তীরের সবচেয়ে উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের অর্থায়ন করছে, যারা ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করতে অবৈধ খামার ব্যবহার করে। অবৈধ বসতির ‘উন্মত্ত সম্প্রসারণ’ এবং ‘সহিংসতা বৃদ্ধিকে’ এই পদক্ষেপ নেওয়ার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ফ্রান্স।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে বলেছেন, এসব পদক্ষেপ পশ্চিম তীরে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের আমদানিতে কোনো বাধা দেবে না বলে জানান তিনি। যুক্তরাজ্যের এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাকে ‘ব্রিটিশ ইহুদিদের জন্য একটি অন্ধকার দিন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ব্রিটেনের প্রধান রাব্বি স্যার এফ্রাইম মিরভিস। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি একে ‘লোক দেখানো রাজনীতি’ উল্লেখ করে বলেন, এর ফলে কেবল চরমপন্থাই শক্তিশালী হবে।

পশ্চিম তীরের বসতিগুলোতে উৎপাদিত প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে খেজুর, সাইট্রাস জাতীয় ফল, লতাপাতা ও ওয়াইন। এগুলো ইসরায়েলের মোট রপ্তানির অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার এই বিষয়টি মূলত প্রতীকী। তবে ইসরায়েল যখন পশ্চিম তীরে আরও এক হাজার নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, ঠিক সেই সময়ে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি জোর দিতেই এই প্রতীকী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জেরুজালেমের অদূরে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের 'ই-১' বসতি প্রকল্প, যা ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত জমিকে দ্বিখণ্ডিত করবে। গাজায় ইসরায়েলি হামলা এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের হামলার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের লক্ষ্যে ২০২৫ সালে অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যও একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। এদিকে জার্মানির বিরোধিতার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) একযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারায় ফ্রান্স একাই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।