ইইউর সতর্কতা উপেক্ষা, বীরের মর্যাদায় বসনিয়ার কসাই'র শেষকৃত্য

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম

বসনীয় সার্ব বাহিনীর সাবেক কমান্ডার রাতকো ম্লাদিচকে সামরিক মর্যাদায় শেষ বিদায় দিয়েছে সার্বিয়া। জাতিসংঘের গঠিত আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ম্লাদিচের শেষকৃত্যে হাজারো মানুষ অংশ নেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সতর্কতা উপেক্ষা করে এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে সার্বিয়ায় তাকে ঘিরে থাকা জাতীয়তাবাদী আবেগও প্রকাশ্যে উঠে এসেছে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বেলগ্রেডের সেন্ট লুক অর্থডক্স চার্চে ম্লাদিচের মরদেহ রাখা হলে সকাল থেকেই সেখানে মানুষের ভিড় জমতে থাকে। তার সামরিক টুপি ও তলোয়ার কফিনের ওপর রাখা ছিল। পরে সার্বীয় সেনাসদস্যরা জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন বহন করে সমাধিস্থলে নিয়ে যান। এ সময় সামরিক ব্যান্ড বাজানো হয় এবং উপস্থিত অনেকে করতালি দিয়ে তাকে বিদায় জানান। সরকারপন্থী গণমাধ্যম অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে।

সার্বীয় অর্থডক্স চার্চের প্রধান প্যাট্রিয়ার্ক পোরফিরিয়ে শেষকৃত্যের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় নেতৃত্ব দেন। অনুষ্ঠানে বসনীয় সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিক এবং সার্বিয়ায় নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার বোটসান-খারচেঙ্কোও উপস্থিত ছিলেন।

ম্লাদিচ গত ২৭ আগস্ট ৮৪ বছর বয়সে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে মারা যান। সেখানে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। ২০১৭ সালে তাকে ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডে ৮ হাজারের বেশি মুসলিম পুরুষ ও কিশোর হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো অবরোধ এবং অমুসলিম বেসামরিক নাগরিক ও যুদ্ধবন্দিদের জন্য আটক শিবির পরিচালনার মতো অন্যান্য যুদ্ধাপরাধেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

ম্লাদিচের মৃত্যুর পর থেকেই তার সমর্থকেরা বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ, মিছিল ও স্মরণ আয়োজন করে আসছেন। বেলগ্রেডে তার ছবি সম্বলিত দেয়ালচিত্র আঁকা হয়েছে। রোববার একটি ফুটবল ম্যাচেও সমর্থকেরা ম্লাদিচের বিশাল ছবি প্রদর্শন করে তার নামে স্লোগান দেন।

তবে বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডের নিহতদের স্বজনদের সংগঠন মাদার্স অব স্রেব্রেনিৎসা এই শেষকৃত্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, গণহত্যার মহিমাকীর্তন কোনো সম্মান নয়, বরং লজ্জার বিষয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক দপ্তরও ম্লাদিচের মতো যুদ্ধাপরাধীদের মহিমান্বিত করা, গণহত্যা অস্বীকার এবং ইতিহাস বিকৃতির নিন্দা জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ড ইউরোপের মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদপ্রত্যাশী দেশগুলোতেও এর কোনো স্থান নেই।

সার্বিয়া বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদপ্রার্থী দেশ। ম্লাদিচকে ঘিরে এমন আয়োজনের প্রতিবাদে ইউরোপীয় কমিশনের সম্প্রসারণবিষয়ক কমিশনার মার্তা কোস তার সার্বিয়া সফর বাতিল করেছেন। তিনি বলেছেন, ম্লাদিচের মৃত্যুকে ঘিরে তার মহিমান্বিতকরণ ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুচিচ বলেছেন, ম্লাদিচের শেষকৃত্যে মানুষের অংশগ্রহণ পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে এক ধরনের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। তার দাবি, এটি সরকারের অনুমোদন বা সমর্থনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা বসনিয়া যুদ্ধের সময় এক লাখের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে। সূত্র: সিএনএন

এম সি এইচ
আরও পড়ুন