ক্ষুধার্ত এক হোটেলকর্মী আপেলে কামড় বসাতেই দাঁতে ঠেকে শক্ত কিছু। মুহূর্তেই তার চোখ কপালে। আপেলের ভেতর লুকিয়ে রাখা বস্তুটি কোনো বীজ নয়, বরং ফ্রান্সের অন্যতম দুর্লভ গোলাপি হীরা। আর সেই হীরাই দুই মাস আগে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক শাতো দ্য শঁতিই দুর্গ থেকে চুরি হয়েছিল।
ঘটনাটি ১৯২৬ সালের। প্যারিসের একটি হোটেলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন সুজান শিল্টজ। এক ডিসেম্বরের দিনে দুই তরুণের কক্ষ পরিষ্কার করার সময় তাদের স্যুটকেসে একটি আপেল দেখতে পান তিনি। ক্ষুধার্ত শিল্টজ সেটি নিয়ে কামড় দিতেই দাঁতে এমন শক্ত কিছু লাগে যে প্রায় দাঁত ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। পরে জানা যায়, সেটি ছিল ৯ দশমিক ০১ ক্যারেটের বিখ্যাত গ্রঁ কঁদে গোলাপি হীরা।
এর মাত্র দুই মাস আগে, প্যারিস থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে শাতো দ্য শঁতিই দুর্গের জাদুঘরে দুর্ধর্ষ চুরি হয়েছিল। মাত্র দুটি লম্বা মই ব্যবহার করে দুই তরুণ চোর জাদুঘর থেকে ৭৫টিরও বেশি গয়না নিয়ে পালিয়েছিল। সে সময় এসব অলংকারের মোট মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ ডলার।
চুরির ধরন দেখে পুলিশ প্রথমে ধারণা করেছিল, এর পেছনে অভিজ্ঞ ও দুর্ধর্ষ চোরের দল কিংবা জাদুঘরের ভেতরের কেউ জড়িত। কিন্তু বাস্তবে চোর লিওঁ কফার ও এমিল সুতের ছিলেন বিশের কোঠার দুই সাবেক ফরাসি বিমানসেনা। এত বড় চুরি করলেও চুরি করা গয়না বিক্রি করতে গিয়ে তারা বিপাকে পড়েন।
শেষ পর্যন্ত পুরো চুরি করা সম্পদ থেকে তারা মাত্র ৩০ হাজার ফ্রাঁ, তৎকালীন হিসাবে প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলার, আয় করতে পেরেছিলেন। তাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল গ্রঁ কঁদে হীরাটি চুরি করা। কারণ হীরাটি এতটাই বিখ্যাত ছিল যে কোনো জুয়েলারি ব্যবসায়ী সেটি কিনতে রাজি হননি। ধরা পড়ার আশঙ্কায় ইউরোপের প্রায় সব পুলিশই তখন হীরাটির খোঁজ করছিল।
পুলিশ যখন চোরদের জিজ্ঞাসাবাদ করছিল, তখন একজন কর্মকর্তার প্রশ্ন ছিল, তোমরা কি আপেল পছন্দ করো? চোরটি অবাক হয়ে পাল্টা জানতে চায়, কেন? উত্তরে পুলিশ জানায়, তার স্যুটকেসে অদ্ভুত বীজসহ একটি আপেল পাওয়া গেছে। সেই আপেলের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বহুমূল্য হীরাটি।
গ্রঁ কঁদে হীরাটির ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ১৭৪০ সাল থেকে এটি কঁদে পরিবারের মালিকানায় ছিল। এর প্রকৃত উৎস কোথায়, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ভারত থেকে বোর্নিও কিংবা ব্রাজিল, বিভিন্ন অঞ্চলের সম্ভাবনা রয়েছে। পরে হীরাটি ফ্রান্সে আসে এবং এর প্রথম পরিচিত মালিক ছিলেন কঁদে পরিবারের সদস্য ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লুই অঁরি দ্য বুরবোঁ।
প্রথমে হীরাটি গোল্ডেন ফ্লিস নাইটহুডের একটি পদকে বসানো ছিল। পরে সেটি খুলে আংটিতে বসানো হয়। অষ্টাদশ শতকের একটি লিখিত নির্দেশনায় কঁদে পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্রদের উত্তরাধিকারসূত্রে পর্যায়ক্রমে হীরাটি পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ফলে এটি শুধু মূল্যবান রত্নই নয়, পরিবারটির প্রতীকী ঐতিহ্যেরও অংশ হয়ে ওঠে।
হীরাটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রকাশ করতে রাজি হননি শাতো দ্য শঁতিইয়ের জাদুঘরের প্রধান ঐতিহ্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা ম্যাথিয়ু দেলদিক। তবে তিনি বলেন, গোলাপি হীরা বাজারের সবচেয়ে দুর্লভ ও দামি রত্নগুলোর মধ্যে পড়ে। ১৯৮৩ সালে কাছাকাছি আকারের একটি গোলাপি হীরার মূল্য ছিল ৫ থেকে ৬ লাখ ডলার। ২০১০ সালে আরও বড় একটি গোলাপি হীরা বিক্রি হয়েছিল ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলারে।
চুরির ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী অক্টোবরে শাতো দ্য শঁতিইয়ে আবার জনসাধারণের সামনে প্রদর্শিত হবে গ্রঁ কঁদে হীরা। এক শতাব্দীর মধ্যে এটিই হবে বড় কোনো উন্মুক্ত প্রদর্শনীতে হীরাটির প্রথম প্রদর্শন।
তবে সাম্প্রতিক চুরির ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্যারিসের লুভর জাদুঘর থেকে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক মুকুটের অলংকার চুরি হয়েছিল, যার অনেকগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় মিসরের রাজপরিবারের মালিকানাধীন প্রায় ৪০ লাখ ডলারের একটি হীরার হার চুরি হয়েছে।
এই আশঙ্কার মধ্যেও গ্রঁ কঁদে হীরাটি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। বরং চুরির পর হীরাটিকে ভবিষ্যতে শনাক্ত করা আরও সহজ করতে বিজ্ঞানীদের দিয়ে এর বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করানো হয়েছে। ফ্রান্স, কানাডা ও সুইজারল্যান্ডের রত্নবিশেষজ্ঞরা এর রাসায়নিক গঠন, স্বচ্ছতা, ঘনত্ব ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে একটি পরিচয়পত্রের মতো তথ্যভান্ডার তৈরি করেছেন।
জাদুঘরের কর্মকর্তাদের আশা, হীরাটির এই অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ্যে থাকলে ভবিষ্যতে এটি চুরি হলেও বিক্রি করা কঠিন হবে। কারণ শত বছর আগে আপেলের ভেতর লুকিয়েও যে হীরাকে বাঁচানো যায়নি, আজ তার পরিচয় গোপন করার সুযোগ আরও কম। সূত্র: সিএনএন