স্কুল ছুটি হয়েছে। শিশুরা বাড়ি ফিরেছে। জুতা খুলে ঘরে ঢোকার আগেই কেউ হাত ধুচ্ছে, কেউ মুখ পরিষ্কার করছে, আবার কেউ পানিতে গলা কুলকুচি করে গার্গল করছে। জাপানে এমন স্বাস্থ্যবিধির চর্চা অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
বাংলায় যাকে আমরা সহজভাবে ‘গরগরা’ বা গার্গল করা বলি, জাপানি সংস্কৃতিতে এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসচেতনতার ধারণা। বিশেষ করে ঠান্ডা, ফ্লু বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মৌসুমে গার্গল করার অভ্যাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—জাপানের প্রতিটি শিশু স্কুল থেকে ফিরেই বাধ্যতামূলকভাবে গার্গল করে, এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। বরং এটি জাপানে প্রচলিত স্বাস্থ্যবিধির একটি অংশ, যা পরিবার, স্কুল ও স্থানীয় স্বাস্থ্যশিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে গড়ে ওঠে।
স্কুল থেকে ফেরার পর কেন গার্গল?
দিনের বড় একটি অংশ শিশুদের কাটে স্কুলে। সেখানে সহপাঠীদের সঙ্গে একই শ্রেণিকক্ষ, খেলাধুলা, খাবারের জায়গা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে হয়। ফলে নানা ধরনের জীবাণুর সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা থাকে।
বাড়ি ফিরে হাত ধোয়া ও গার্গল করার ধারণাটি মূলত বাইরে থেকে শরীরে আসা জীবাণুর সংস্পর্শ কমানোর স্বাস্থ্যবিধির অংশ। জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও বাইরে থেকে ফেরার পর সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়।
গার্গল করার উদ্দেশ্যও মুখ ও গলার ভেতরের অংশ পরিষ্কার রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে জাপানে বহুদিন ধরে এই অভ্যাসকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
জাপানে গার্গলের পুরোনো সংস্কৃতি
জাপানে গার্গল করা নতুন কোনো স্বাস্থ্য-ট্রেন্ড নয়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বহু দশক ধরে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধে গার্গল করার পরামর্শ দিয়ে আসছে। ফলে এটি ধীরে ধীরে জাপানি দৈনন্দিন স্বাস্থ্যচর্চার একটি পরিচিত অংশ হয়ে উঠেছে।
শিশুদের ক্ষেত্রেও এর চর্চা দেখা যায়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদি জাপানি গবেষণায় ৩৮ হাজারের বেশি শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, শিশুদের মধ্যে হাত ধোয়া ও গার্গল করার স্বাস্থ্যশিক্ষা বেশ প্রচলিত এবং দুটি অভ্যাসই অনেক ক্ষেত্রে একসঙ্গে শেখানো হয়।
অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখানো হয়—বাইরে থেকে এসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, আশপাশের মানুষের সুরক্ষার সঙ্গেও জড়িত।
গার্গল করলে কি সত্যিই সর্দি-ফ্লু ঠেকানো যায়?
এখানেই বিষয়টি একটু জটিল। জাপানে গার্গল করার জনপ্রিয়তা অনেক বেশি হলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল সব ক্ষেত্রে একরকম নয়। ২০১৪ সালে জাপানের শিজুওকা অঞ্চলের ছয়টি উচ্চবিদ্যালয়ের ৭৫৭ শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটি র্যান্ডমাইজড গবেষণা হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের দিনে তিনবার গার্গল করতে বলা হয়েছিল—কেউ গ্রিন টি দিয়ে, কেউ সাধারণ পানি দিয়ে। গবেষণায় গ্রিন টি দিয়ে গার্গল করার ক্ষেত্রে সাধারণ পানির তুলনায় ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়নি।
আরেকটি বড় পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় জাপানের ১৪৫টি নার্সারি স্কুলের ২ থেকে ৬ বছর বয়সী ১৯ হাজার ৫৯৫ শিশুকে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। সেখানে দিনে অন্তত একবার গার্গল করা শিশুদের মধ্যে জ্বর হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম দেখা যায়। তবে গবেষকরা এটিকে গার্গল করার নিশ্চিত কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে দেখেননি; আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের গবেষণায় হাত ধোয়া ও গার্গল করার স্বাস্থ্যশিক্ষার সঙ্গে ছোট বয়সে ইনফ্লুয়েঞ্জা কম হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেলেও বড় বয়সে একই ধরনের প্রতিরোধমূলক প্রভাব সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।
আসল শিক্ষা গার্গলের চেয়েও বড়
জাপানি শিশুদের এই অভ্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত গার্গল নিজে নয়, বরং স্বাস্থ্যবিধিকে ছোটবেলা থেকেই দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা।
শিশু স্কুল থেকে ফিরবে, হাত ধুবে, প্রয়োজনে গার্গল করবে, পরিষ্কার পোশাক পরবে—এসব কাজ সেখানে শুধু অসুস্থ হওয়ার পর করার বিষয় নয়। বরং নিয়মিত জীবনযাপনের অংশ হিসেবে শেখানো হয়।
এতে শিশুর মধ্যে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার পাশাপাশি অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধও তৈরি হয়। কারণ একটি সংক্রামক রোগ শুধু একজনকে আক্রান্ত করে থেমে থাকে না; পরিবার, সহপাঠী ও সমাজের অন্য মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কী শিখতে পারে?
বাংলাদেশেও শিশুদের হাত ধোয়া, কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা, বাইরে থেকে এসে পরিচ্ছন্ন হওয়া এবং অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার শিক্ষা আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেওয়া যেতে পারে।
তবে জাপানের গার্গল সংস্কৃতিকে হুবহু অনুসরণ করার চেয়ে এর পেছনের অভ্যাস গড়ে তোলার দর্শনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যবিধি যেন শুধু কোনো রোগের মৌসুমে নয়, প্রতিদিনের জীবনের স্বাভাবিক আচরণ হয়ে ওঠে—সেটিই মূল শিক্ষা।
তাই ‘জাপানি শিশুরা বাড়ি ফিরেই গরগরা করে’—এই দৃশ্যকে শুধু একটি অদ্ভুত অভ্যাস হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। এর ভেতরে রয়েছে দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্যচর্চা, শিশুদের স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতাকে দৈনন্দিন সংস্কৃতির অংশ করে তোলার একটি সামাজিক প্রচেষ্টা।
আর সেই কারণেই, স্কুলের ব্যাগ নামানোর পর একটি ছোট্ট গার্গল কখনো কখনো শুধু গলা পরিষ্কার করার কাজ নয়—এটি হতে পারে ছোটবেলা থেকে শেখা নিজেকে এবং অন্যকে সুরক্ষিত রাখার অভ্যাসের অংশ।
ব্রিকস সম্মেলনের আগেই ভারতে রাশিয়ার ৩ সামরিক বিমান
তুলার মতো ভেসেছিলো দুই-তিনতলা বাড়ির সমান পাথর!
নির্বাচনে জিতলে প্রত্যেক আমেরিকানকে ৫ হাজার ডলার করে দেব: ট্রাম্প