ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে দেশটির জনগণের সাহস, বীরত্ব ও দৃঢ়তায় পুরো বিশ্ব বিস্মিত বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মস্কোতে ভালদাই আলোচনা ক্লাবের ২৩তম বার্ষিক বৈঠকের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ কথা বলেন।
পুতিন বলেন, বিশ্ববাসী ইরানে কী ঘটছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইরানের জনগণের সাহস, বীরত্ব ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দৃঢ় থাকার ক্ষমতা বিশ্বকে বিস্মিত করছে।
ইরানের প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের বড় একটি ভাণ্ডার রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন রুশ প্রেসিডেন্ট। তার ভাষ্য, এসব ব্যক্তিরা নিজেদের জনগণের স্বার্থে আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে সামরিক হামলার প্রসঙ্গ টেনে পুতিন বলেন, কয়েক মাস আগে দেশ দুটি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালায় এবং দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হত্যা করে। ওই সময় তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনাতেও যুক্ত ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানিকে হত্যার ঘটনাকে বড় ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেন পুতিন। তিনি বলেন, লারিজানিকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভালোভাবে চিনতেন এবং তিনি ইতিবাচক মানসিকতার মানুষ ছিলেন। ইরানের জনগণের স্বার্থে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমঝোতার পথ খুঁজতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন বলেও মন্তব্য করেন পুতিন।
রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, আইনি মূল্যায়ন যা-ই হোক, লারিজানিকে হত্যা করা একটি ভুল ছিল। কারণ পারস্য উপসাগরে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সমঝোতা ও সমাধানের পথ খুঁজতে বর্তমানে তার মতো একজন ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল।
পুতিন জানান, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে আলোচনার জন্য লারিজানি রাশিয়া সফর করেছিলেন। তার সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ সম্ভব ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রুশ প্রেসিডেন্ট স্মরণ করেন, একপর্যায়ে তেহরান ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় স্থানান্তরের একটি প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলও প্রাথমিকভাবে ওই ব্যবস্থায় সম্মতি জানিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
পুতিন বলেন, ২০১৫ সালে মস্কো এ ধরনের একটি স্থানান্তর সম্পন্ন করেছিল এবং প্রয়োজনে আবারও তা করতে প্রস্তুত ছিল। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান কঠোর করে এবং ইউরেনিয়াম শুধু যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর দাবি জানায়। এরপর ইরানও নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করে।
পুতিনের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে লারিজানি ইরানের ভূখণ্ডে রাশিয়া ও ইরানের যৌথ উদ্যোগে ওই উপাদানকে পাতলা করার একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, মস্কোর প্রস্তাব এখনো কার্যকর রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর আরোপিত অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আশাও প্রকাশ করেন পুতিন। তিনি বলেন, তেহরান যে লক্ষ্য অনুসরণ করছে, তা ন্যায্য। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলে বাব আল-মান্দাবসহ এসব নৌপথে চলাচলের ওপর কোনো বিধিনিষেধ থাকার কারণ থাকবে না এবং রাশিয়া এ অবস্থানকে সমর্থন করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ও পশ্চিমা চাপের মধ্যে ইরান ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। গত বছর দুই দেশ ২০ বছরের একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। একই সঙ্গে রাশিয়া বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন ইউনিট নির্মাণের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে রাশিয়ার কর্মকর্তারা বারবার নিন্দা করেছেন। ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে সংঘাতের সমাধানে মধ্যস্থতার জন্য মস্কো সহযোগিতার প্রস্তাবও দিয়েছে। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি