অপমানজনক পরাজয়ে ইরাক থেকে বিতাড়িত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: কানি

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের প্রত্যাহারকে ওয়াশিংটনের অপমানজনক পরাজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কানি। তিনি বলেছেন, ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিতাড়িত করা হয়েছে এবং ইরাকিরা প্রতিরোধের মাধ্যমে এই বিজয় অর্জন করেছে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাতে তেহরানে নাসর কারিব অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন কানি। লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলনের দুই নেতা সৈয়দ হাসান নাসরাল্লাহ ও সৈয়দ হাশেম সাফিয়েদ্দিনের শাহাদাতের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

কানি বলেন, বিপুল সম্পদ ও সামরিক সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে বিতাড়িত হয়েছে। ইরাকি জনগণ এই বিজয় উদযাপন করছে। তার মতে, ইরাকি জাতি ও প্রতিরোধ ফ্রন্টের সদস্যদের প্রতিরোধের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি কঠিন হলেও সৃষ্টিকর্তার কৃপা ও শক্তিতে প্রতিরোধ ফ্রন্ট এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিরোধ ফ্রন্টের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বর্তমানে ঐক্য দেখা যাচ্ছে এবং পরিকল্পিত ও হিসাব করে নেওয়া পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা শত্রুকে চমকে দিচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে কানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল চার দিনের মধ্যে, সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের হিসাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে ওয়াশিংটন।

শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী হোসেইনি খামেনির বক্তব্য স্মরণ করে কানি বলেন, নাসর শুক্রবারের নামাজের সময় তিনি মুসলিমদের ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। তার মতে, মুসলিমদের ঐক্য সম্মান বয়ে আনে এবং সৃষ্টিকর্তার প্রজ্ঞায় তাদের লক্ষ্য অর্জনের পথ তৈরি করে।

কানি বলেন, একটি জাতির ওপর শত্রুর আগ্রাসন হলে অন্য জাতিগুলোরও সতর্ক থাকা এবং নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়ানো উচিত। কারণ শত্রু কোনো একটি জায়গায় সফল হলে পরবর্তী সময়ে অন্য জায়গাকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে।

আফগানিস্তান থেকে ইয়েমেন এবং ইরান থেকে গাজা ও লেবানন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে প্রতিরক্ষা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান কুদস ফোর্সের এই কমান্ডার।

ইরাক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে বিতাড়িত করেছে। সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রতিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত থাকলে ইরাক আরও সমৃদ্ধি, দৃঢ়তা ও সার্বভৌমত্বের দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কানি আরও বলেন, অন্যান্য ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির অবশিষ্ট চিহ্নগুলো দূর করতে হবে এবং এর লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। তার দাবি, বিমান চলাচলের মতো পার্শ্ববর্তী বিষয় সামনে এনে ওয়াশিংটন বিশ্ব জনমতের কাছে ইরাক থেকে নিজেদের বিতাড়নের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রসঙ্গে কানি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতেই এ হামলা চালানো হয়েছিল। তার দাবি, ৪৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও বৈরী কর্মকাণ্ড মোকাবিলা করে আসছে ইরান। মধ্যস্থতাকারী ও অন্যান্য পদ্ধতিতে ফল না পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়।

তিনি বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার পরিকল্পনা করেছিল তারা। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কৃপা ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনায় দেশটির জনগণ দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে এবং একের পর এক শত্রুর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে।

কানি দাবি করেন, যুদ্ধের চরম সময়েও ইরান তার মিত্র ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হাতে নিপীড়িত জনগণের কথা ভুলে যায়নি। ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থাকার কথা জানান তিনি।

লেবাননের হিজবুল্লাহ প্রসঙ্গে কানি বলেন, সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধগুলোর একটিতে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছে। হিজবুল্লাহ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের আর প্রতিরোধের সক্ষমতা নেই, এমন প্রচার চালানো হলেও যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই দিন পরই সংগঠনটির যোদ্ধারা মাঠে নামে বলে দাবি করেন তিনি।

কানি বলেন, হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা এমন বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছে যে বিশ্বজুড়ে বন্ধু ও শত্রু উভয় পক্ষই বিস্মিত হয়েছে। হিজবুল্লাহর মহাসচিব শেখ নাঈম কাসেমের আশুরা ও কারবালার চেতনায় লড়াইয়ের বক্তব্যও উল্লেখ করেন তিনি।

ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও দাবি করেন কানি। তার ভাষ্য, এই যুদ্ধে ইসরায়েলের নিহতের সংখ্যা তাদের ইতিহাসের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হলেও তারা সেই হতাহতের সংখ্যা গোপন করছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার এর আগে আইআরজিসি বলেছিল, ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার পশ্চিম এশিয়া ও পুরো মুসলিম বিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিতাড়নের সূচনা করবে।

বুধবার ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাগদাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া চুক্তির আওতায় ইরাকের এরবিলের একটি ঘাঁটি থেকে সর্বশেষ মার্কিন সেনারা চলে যায়। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদি এই প্রত্যাহারকে দেশের সার্বভৌমত্ব, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্বের নতুন পর্বের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

২০০৩ সালের মার্চে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, এমন দাবির ভিত্তিতে অভিযান চালানো হলেও পরে সেই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাক থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। তবে ২০১৪ সালে দায়েশের উত্থানের পর আবারও দেশটিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি ফিরে আসে। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত