ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মনে করছেন, নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে ইসরায়েলের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করেও মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে নেতানিয়াহুর আঞ্চলিক নীতির প্রতি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপদেষ্টার অসন্তোষ বেড়েছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, গাজায় শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং সিরিয়া ও লেবানন নিয়ে ইসরায়েলের নীতিতে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের একাংশ মনে করেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের পরিবর্তে অন্য কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে আঞ্চলিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ট্রাম্প নিজে নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এর ফলে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য আরও আলোচনায় এসেছে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা তাঁকে ইসরায়েলের নির্বাচনে সরাসরি পক্ষ না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ও শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে মতপার্থক্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার গাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিলম্ব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার অসন্তোষ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দলের ধারণা, লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ইসরায়েল আরও ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসরায়েলের নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানকে ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক নীতি নিয়ে ট্রাম্পকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে নতুন সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না, তা নিয়েও ওয়াশিংটনে আলোচনা হয়েছে বলে অ্যাক্সিওসের পৃথক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নেতানিয়াহু নতুন সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের একাংশ আপাতত সামরিক হামলার পরিবর্তে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা নিশ্চিত নয়।
ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাত শুরু হলে তা শুধু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতিতেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের একটি অংশের ধারণা, নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কোনো নেতৃত্ব ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক সমঝোতা নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে নতুন সরকার গঠিত হলে তার নীতি কী হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সাবেক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা গাদি আইজেনকোটের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন। নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী জোট আলোচনা দেশটির ভবিষ্যৎ সরকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। ফলে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু একজন নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়; নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা, ইরান নীতি এবং আঞ্চলিক স্বার্থও এতে ভূমিকা রাখে।
নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে বর্তমান সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে পারে। অন্য কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে গাজা, সিরিয়া, লেবানন ও ইরান নিয়ে আলোচনার ধরন বদলাতে পারে। তবে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের নির্বাচনকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে: নেতানিয়াহুর সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প পথ খোলা রাখা।
সূত্র: অ্যাক্সিওস, আনাদোলু এজেন্সি।