আট শতকের মুসলিম শাসনের স্মৃতি, প্রাচীন স্থাপত্য আর ইসলামের ঐতিহ্য, এসবের টানে দক্ষিণ স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলে নতুন করে বসতি গড়ছেন ইউরোপের কিছু মুসলিম। তাঁদের কাছে এই অঞ্চল কেবল রোদেলা আবহাওয়া কিংবা শান্ত জীবনযাপনের জায়গা নয়; বরং ইউরোপের ইতিহাসে ইসলামের দীর্ঘ উপস্থিতির সঙ্গে নিজেদের পরিচয় ও শিকড়কে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ।
স্পেনের মালাগা শহর থেকে পাহাড়ি উপত্যকার দিকে এগোলে চোখে পড়ে জলপাই, ডালিম, কমলা ও সাইপ্রেস গাছের সারি। পাহাড়ের ঢালে সাদা রঙের গ্রাম আর পুরোনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও টিকে আছে আরবি ভাষা ও মুসলিম শাসনের নানা চিহ্ন। আন্দালুসিয়ার আলোরার পাহাড়ে এমনই এক পুরোনো খামারবাড়িকে ঘিরে গড়ে উঠছে ‘হাউস অব আন্দালুস’। ব্রিটিশ-হাঙ্গেরীয় মুসলিম হেনরিয়েটা সোভাতি ও তাঁর স্বামী, ইমাম ও থেরাপিস্ট আজমল মাসরুর ২০২৪ সালে বাড়িটি কেনেন। তাঁদের লক্ষ্য, ইসলামের ইতিহাস ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে কাছাকাছি নিয়ে আসা।
বাড়িটির আশপাশের ১৪ হেক্টর জমিতে প্রায় ৪০০টি জলপাইগাছ রয়েছে। আরও গাছ লাগিয়ে বাগানটিকে এক হাজার জলপাইগাছের বাগানে পরিণত করতে চান হেনরিয়েটা। সেখানে শিল্পচর্চা ও দম্পতিদের জন্য অবকাশযাপনের আয়োজন শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে কোরআনে উল্লেখিত উদ্ভিদ নিয়ে একটি বাগান, ইসলামের ইতিহাসবিষয়ক শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং একটি গ্রন্থাগার গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিমদের জন্যও জায়গাটির দরজা খোলা রাখতে চান তাঁরা।
হেনরিয়েটার কাছে আন্দালুসিয়ায় বসবাসের আকর্ষণের আরেকটি দিক স্থানীয় মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক। ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও সেখানে নিজেকে বহিরাগত মনে হতো বলে জানান তিনি। বিপরীতে, স্পেনের এই পাহাড়ি এলাকায় প্রতিবেশীরা তাঁকে আগে একজন মানুষ হিসেবে দেখেন, এটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পাশের বাড়ির বাসিন্দা হুয়ান গার্সিয়ার কাছ থেকে তিনি লেবু, অ্যাভোকাডো ও মধু কেনেন; কখনো জলপাই সংগ্রহেও সাহায্য করেন প্রতিবেশী। হুয়ানের ৭৯ বছর বয়সী মা মারিয়ার সঙ্গে হেনরিয়েটার কথোপকথনেও ধর্মীয় পার্থক্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। হেনরিয়েটা মুসলিম এবং মাথা ঢেকে রাখেন ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে, এ কথা জানার পর ক্যাথলিক মারিয়া ভার্জিন মেরির মাথা ঢেকে রাখার প্রসঙ্গ তোলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ভালো মানুষ হওয়ার গুরুত্ব।
এই অঞ্চলের প্রতি মুসলিমদের আকর্ষণের পেছনে রয়েছে আল-আন্দালুসের ইতিহাস। মধ্যযুগে আধুনিক স্পেন ও পর্তুগালের বিস্তীর্ণ অংশ মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল। প্রায় আট শতক ধরে বিভিন্ন মুসলিম রাজবংশ আইবেরীয় উপদ্বীপের কিছু অংশ শাসন করে। কর্ডোবা, সেভিল ও গ্রানাডার মতো শহরে আজও টিকে থাকা প্রাসাদ, দুর্গ, খিলান, নকশাদার টালির কাজ, অলংকৃত দেয়াল এবং আরবি ক্যালিগ্রাফি সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে। সেচব্যবস্থা, ভাষা, জ্ঞানচর্চা ও স্থানীয় ঐতিহ্যেও মুসলিম শাসনের প্রভাব রয়ে গেছে। ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মধ্য দিয়ে উপদ্বীপে মুসলিম শাসনের শেষ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
তবে মুসলিমদের এই ঐতিহাসিক শিকড়ের অনুসন্ধান শুধু হেনরিয়েটার প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। ব্রিটিশ মুসলিম লেখক ও ইতিহাসবিদ তারিক হুসেইনের মতে, আল-আন্দালুসের স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক স্মারক ইউরোপীয় মুসলিমদের মনে এই ধারণা জোরদার করে যে ইসলাম ইউরোপের জন্য নতুন কোনো ধর্ম নয়; বরং মহাদেশটির ইতিহাসেরও অংশ। তাঁর মতে, ইউরোপের অতীতের প্রচলিত বর্ণনায় মুসলিমদের উপস্থিতি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। তবে ইউরোপের মুসলিম ইতিহাসকে শুধু আল-আন্দালুসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাও ঠিক নয়, কারণ মহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে।
গ্রানাডায় মুসলিম সম্প্রদায়ের পুনরুত্থানের ইতিহাসও এই সম্পর্কের আরেকটি দিক তুলে ধরে। শহরের আলহামব্রা প্রাসাদের বিপরীতে অবস্থিত গ্রেট মসজিদ অব গ্রানাডা ২০০৩ সালে চালু হয়। মসজিদটি নির্মাণে প্রায় দুই দশক ধরে তহবিল সংগ্রহ, আইনি জটিলতা ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা বাধা মোকাবিলা করতে হয়েছিল। কয়েক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে স্পেনে আসা মুনিরা মেনডোনসাও এই সম্প্রদায় গড়ে তোলার প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তরুণ বয়সে ইসলাম সম্পর্কে অনুসন্ধান শুরু করার পর তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা গ্রানাডায় একটি স্থায়ী মুসলিম সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরে মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলিমরাও শহরটিতে বসতি গড়েন।
আন্দালুসিয়ার আলপুহারাস পাহাড়ি অঞ্চলেও মুসলিম ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন জীবন গড়ছেন অনেকে। গ্রানাডায় জন্ম নেওয়া লেখক, গায়িকা ও শিক্ষক মদিনা তেনুর হোয়াইটম্যানের পরিবার ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ইসলাম গ্রহণের পর এই অঞ্চলে এসেছিল। জীবিকার অনিশ্চয়তায় পরিবারটি পরে যুক্তরাজ্যে ফিরে গেলেও মদিনা ২০০৫ সালে আবার আন্দালুসিয়ায় ফিরে আসেন। তাঁর মতে, আলহামব্রা ও কর্ডোবার মসজিদ-গির্জার মতো স্থাপনা ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে এবং মানুষকে অতীতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক অনুভব করতে সাহায্য করে। তবে তাঁর কাছে স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা ও পারস্পরিক যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আন্দালুসিয়ার মুসলিম অতীতের স্মৃতি শুধু স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ নয়; খাবার ও দৈনন্দিন সংস্কৃতিতেও এর সম্ভাব্য ছাপ রয়েছে। আলোরার বার্ষিক ‘সোপাস পেরোতাস’ উৎসবে হাজারো মানুষ ঐতিহ্যবাহী রুটির স্যুপ খেতে জড়ো হন। স্থানীয়ভাবে কৃষিশ্রমিকদের খাবার হিসেবে পরিচিত এই পদে বাসি রুটি, জলপাই তেল, রসুন, টমেটো, মরিচ ও বিভিন্ন সবজি ব্যবহৃত হয়। খাদ্য-ইতিহাসবিদ নাওয়াল নাসরাল্লাহর মতে, মধ্যযুগীয় আন্দালুসি রান্নার ‘জিনানিয়্যা’ নামের একটি পদ থেকে এই স্যুপের ধারণা আসতে পারে। তবে এ খাবারের উৎপত্তি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে একক কোনো মত নেই।
এই অঞ্চলের ইতিহাস অবশ্য শুধু সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের গল্প নয়। ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের পর মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে ভঙ্গ করা হয়। তাঁদের জোর করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয় এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ষোড়শ শতকের শেষ দিকে আলপুহারাস অঞ্চল মুসলিম বংশোদ্ভূত মরিস্কোদের প্রতিরোধের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। স্প্যানিশ রাজশক্তি সেই প্রতিরোধ দমন করে; বহু মানুষ নিহত হন, গ্রাম ধ্বংস হয় এবং পরে ১৬০৯ থেকে ১৬১৪ সালের মধ্যে মরিস্কোদের স্পেন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
বর্তমান স্পেনেও মুসলিমদের জন্য সবকিছু নির্বিঘ্ন নয়। দেশটির কট্টর ডানপন্থী ভক্স পার্টি অভিবাসন এবং স্পেনের ‘ইসলামায়ন’ বলে অভিহিত বিষয়টির বিরোধিতাকে রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছে। জাতি ও ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের অভিজ্ঞতাও এক নয়। মদিনা তেনুর হোয়াইটম্যান মনে করেন, তাঁর শ্বেতাঙ্গ পরিচয়ের কারণে স্পেনে তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁর ইরানি স্বামীর অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন হতে পারে। তাঁর মতে, সত্যিকারের সম্প্রদায় গড়ে ওঠে পারস্পরিক যত্ন, স্থানীয় ভাষা শেখা এবং পরিচিত গণ্ডির বাইরে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে।
হেনরিয়েটার হাউস অব আন্দালুস প্রকল্পের কাজ এখনও শেষ হয়নি। জলপাই সংগ্রহ, পানির সংকট, সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম আসতে দেরি এবং অর্থের চাপ, সবই সামলাতে হচ্ছে তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে। তবু তিনি চান, জায়গাটি ইউরোপের ইতিহাসে ইসলামের অবদানকে নতুনভাবে জানার সুযোগ করে দিক এবং মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক ও নিজেদের জীবনের অগ্রাধিকার নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করুক। তাঁর কাছে আন্দালুসিয়া অতীতের কোনো হারানো রাজ্যকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন নয়; বরং ইতিহাস, বিশ্বাস, প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবন মিলিয়ে বর্তমানেই নিজের জায়গা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা। সূত্র: আলজাজিরা