পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে চলমান রাজনৈতিক লড়াই এবার ব্যক্তিগত আক্রমণ ও প্রোটোকল বিতর্কে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি দার্জিলিং সফরে আসা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে অভ্যর্থনা না জানানো নিয়ে মোদির সমালোচনার জবাবে একটি দুই বছর পুরানো ছবি জনসমক্ষে এনে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছেন মমতা।
রোববার (৮ মার্চ) এক জনসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ প্রবীণ বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানিকে ‘ভারতরত্ন’ প্রদানের সময় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু দাঁড়িয়ে আছেন, অথচ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর পাশেই চেয়ারে বসে আছেন।
এই ছবিকে হাতিয়ার করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এটি আপনার জন্য। আপনি কি রাষ্ট্রপতিকে সম্মান করেন? তিনি একজন নারী এবং আদিবাসী নেত্রী। তাহলে ওই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি কেন দাঁড়িয়ে ছিলেন আর আপনি কেন বসে ছিলেন?’ মমতার দাবি, প্রধানমন্ত্রী যখন রাষ্ট্রপতির পদের প্রতি শ্রদ্ধার বড় বড় বুলি আওড়ান, তখন এই ছবিই প্রমাণ করে কে আসলে সম্মান করে আর কে করে না।
তৃণমূলের এই আক্রমণের জবাবে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, এটি তৃণমূলের ‘ফেক নিউজ ফ্যাক্টরি’র নতুন চাল। বিজেপি দাবি করেছে, ভারতরত্ন প্রদানের দাপ্তরিক প্রোটোকল অনুযায়ী, যখন রাষ্ট্রপতি সম্মাননা প্রদান করেন তখন উপস্থিত অন্যদের বসে থাকার নিয়ম রয়েছে। এখানে কোনো শিষ্টাচার লঙ্ঘন হয়নি এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ মুহূর্তকে তৃণমূল নোংরা রাজনীতির জন্য ব্যবহার করছে।
তর্কযুদ্ধের শুরু গত শনিবার, যখন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু দার্জিলিংয়ে নবম আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন। সেখানে ভাষণের সময় রাষ্ট্রপতি আক্ষেপ করে বলেন, তাঁকে স্বাগত জানাতে মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না। তিনি মমতাকে ‘ছোট বোন’ হিসেবে সম্বোধন করে বলেছিলেন, ‘আমি বাংলার মেয়ে হিসেবে এখানে এসেছি, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী কেন এলেন না তা আমার জানা নেই।’
রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিষয়টিকে ‘লজ্জাজনক ও নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যখন সারা দেশ নারী দিবস উদযাপন করছে, তখন তৃণমূল সরকার একজন আদিবাসী নারী রাষ্ট্রপতিকে অপমান করেছে।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রোটোকল ভঙ্গের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, অনুষ্ঠানটি একটি ব্যক্তিগত সংস্থা আয়োজন করেছিল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে প্রশাসন আগে থেকেই উদ্বেগ জানিয়েছিল। মমতা দাবি করেন, রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকে অনুমোদিত তালিকায় তাঁর নাম ছিল না, তাই তিনি যাননি।
এই বাগযুদ্ধ কেবল কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন এই ঘটনায় প্রোটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে রাজ্যের মুখ্য সচিবের কাছে রিপোর্ট তলব করেছেন। রিপোর্টে চারটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট জানতে চাওয়া হয়েছে:
১. রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানাতে মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্য সচিব ও পুলিশ প্রধান কেন অনুপস্থিত ছিলেন?
২. রাষ্ট্রপতির জন্য নির্ধারিত ওয়াশরুমে পানি ছিল না কেন?
৩. রাষ্ট্রপতির যাতায়াতের পথে কেন আবর্জনা ছিল?
৪. স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?