পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম বাংলাদেশিদের পুশইন,  বাড়ছে ধর্মীয় উত্তেজনা

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকহারে বাংলাদেশি মুসলমানদের বিতাড়নের ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যেটিতে নথিপত্রহীন মুসলিম বাংলাদেশি অভিবাসীদের চিহ্নিত করে আটক ও নির্বাসনের এক ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে, যা সীমান্তের উভয় পাশে তীব্র মানবিক সংকট ও গভীর ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরি করেছে। 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিপুল ভোটে ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মাথায় এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল।

নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে রাজ্যজুড়ে শুরু হওয়া ‘শনাক্ত করো, নির্মূল করো এবং নির্বাসন’ নীতির কারণে হাজার হাজার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইতিমধ্যে প্রায় ৫,০০০ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আরও শত শত মানুষকে নবনির্মিত আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তবে এই অভিযান নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।

ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গ্রাম হাকিমপুরের একটি চেকপয়েন্টে প্রখর রোদ ও তীব্র আর্দ্রতার মাঝে শত শত মানুষের ভিড় দেখা গেছে। সেখানে কাঁচা ইট ও সিমেন্টের তৈরি একটি সংকীর্ণ অসম্পূর্ণ ভবনে পানীয় জলের অভাবে চরম দুর্ভোগের মধ্যে অপেক্ষা করছেন বহু মুসলিম অভিবাসী, যাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে সীমান্তে আনা হয়েছে। 

উন্নত জীবিকা ও চিকিৎসার সন্ধানে দালালের মাধ্যমে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আসা এই মানুষদের জীবনের গল্পগুলো প্রায় একই রকম। খুলনার সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি রাইসুল ইসলাম জানান, দুই বছর আগে স্ত্রীর চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য তিনি প্রায় ২৫০ ডলার খরচ করে সপরিবারে কলকাতায় আসেন। সেখানে দৈনিক প্রায় ১০ ডলার আয়ের মাধ্যমে তাদের সংসার ভালোভাবে চললেও নতুন সরকার আসার পর স্থানীয় ও পুলিশের হয়রানির ভয়ে তারা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ৪২ বছর বয়সী মিরাজুল গাজী, যিনি পাঁচ বছর ধরে কলকাতায় নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। 

সরকার বদলের পর বাড়িওয়ালার উচ্ছেদ নোটিশ ও স্থানীয়দের হামলার ভয়ে তিনি স্ত্রী সাবিনা ও ছেলে নায়েমকে নিয়ে দেশে ফেরার পথ ধরেন। হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিদিন সেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ জন নথিবিহীন মানুষ আসছেন, যাদের নাগরিকত্ব যাচাই এবং ডিজিটাল রেকর্ডের জন্য বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়া হচ্ছে। কলকাতার এক সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিশ্চিত করেছেন যে, এ পর্যন্ত ৪,৮০০ জন অনুপ্রবেশকারীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আটক কেন্দ্রে থাকা বাকি ৮৩৬ জনকেও দ্রুত নির্বাসিত করা হবে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই নীতি কেবল বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যেই নয়, রাজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ ভারতীয় মুসলমানদের একাংশেরও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই উচ্ছেদ অভিযান শুধুমাত্র মুসলিমদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে এবং একটি বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনের কারণে হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মের অভিবাসীরা এর আওতামুক্ত থাকবেন। এর ফলে প্রথমবারের মতো আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর ধর্মীয় পরীক্ষা আরোপ করা হলো।

এছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক রায় অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকদের অধিকার সীমিত করায়, কর্তৃপক্ষ আটককৃতদের আদালতে না নিয়েই সরাসরি নির্বাসনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে প্রতিবেশী রাজ্য আসামে একই ধরনের অভিযানে বহু ভারতীয় মুসলমানকে জোরপূর্বক পুশব্যাক করা হলে তারা নো-ম্যান’স ল্যান্ডে আটকে পড়েছিলেন এবং পরে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। 

এখন পশ্চিমবঙ্গেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা বিজেপির দীর্ঘদিনের মুসলিম প্রান্তিকীকরণ ও ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার বৃহত্তর রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অতীতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তবে ভারত যেখানে তিব্বতি বা শ্রীলঙ্কান তামিল শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়, সেখানে বাংলাদেশি ও মায়ানমারের সামরিক জান্তার হাত থেকে পালিয়ে আসা মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন এই নির্বাসনকে ‘অবৈধ ও সম্পূর্ণ অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে আটককৃতদের আইনি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে ভারতের মানবাধিকার কর্মী তিস্তা সেতলবাদ অভিযোগ করেন, সরকার নিজস্ব নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে যথেচ্ছভাবে মানুষকে পণ্যের মতো আটক কেন্দ্রে বন্দি করছে।

এদিকে, এই গণ-গ্রেপ্তার ও পুশব্যাকের ঘটনা ঢাকা এবং নয়াদিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছিল, যা এখন আরও ঘনীভূত হয়েছে। 

ঢাকা সরকারের পক্ষ থেকে নথিবিহীন অভিবাসীদের জাতীয়তা যাচাইয়ের আন্তর্জাতিক ও প্রচলিত দ্বিপাক্ষিক পদ্ধতি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবাইদ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে, এই বিষয়ে নিয়ম মেনে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তারা নয়াদিল্লিকে ইতিমধ্যে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি পাঠিয়েছেন এবং এই দমনপীড়ন দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। 

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গত ৪ জুন থেকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-র অন্তত ১৮টি পুশব্যাকের চেষ্টা তারা ব্যর্থ করে দিয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সোমবার থেকে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর মধ্যে তিন দিনব্যাপী জরুরি আলোচনা শুরু হয়েছে। 

তবে বাংলাদেশের সমালোচনার জবাবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেছেন যে, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাদের নিজস্ব আইন রয়েছে এবং ভারতের পক্ষ থেকে ২,৮০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশির তথ্য ঢাকার কাছে জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। এই কূটনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের মাঝেই হাকিমপুর সীমান্তে নেমে আসা অন্ধকারের সাথে সাথে রাইসুল ইসলামের মতো অসহায় মানুষদের দীর্ঘশ্বাস ভারী হচ্ছে, যাদের সন্তানদের ভালো জীবনের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী তুলে নিয়ে যাচ্ছে আটক কেন্দ্রের অনিশ্চিত অন্ধকারে।

সূত্র: আল জাজিরা

AHA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত