বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির এক মাসের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে প্রায় দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস দলে ভাঙন ও নেতৃত্ব সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দলের ভেতরে ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহের ফলে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক কর্তৃত্ব এখন চরম হুমকির মুখে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মনোনয়ন দেন। তবে এই মনোনয়নের প্রস্তাবনা পত্রে বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ তোলেন দুই নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মমতা তাদের দল থেকে বহিষ্কার করলে দলটির একটি বড় অংশ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
এই বিদ্রোহের গভীরতা স্পষ্ট হয় যখন মমতার ডাকা ৮০ জন বিধায়কের বৈঠকে হাজির হন মাত্র ২০ জন। এমনকি রাজপথের কর্মসূচিতে মমতার পাশে দলের মাত্র ৮ জন বিধায়ক এবং ৬ জন এমপি উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে দলের ৫৮ জন বিধায়ক বহিষ্কৃত ঋতব্রতকে সমর্থন জানিয়ে স্পিকার রাথিন্দ্র বোসের কাছে চিঠি দেন এবং নতুন তৃণমূল কংগ্রেস গড়ার ঘোষণা দেন। একই দিনে কলকাতার মেয়র ও মমতার ঘনিষ্ঠ ফিরহাদ হাকিমও পদত্যাগ করায় দলটির ভাঙনের ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বিদ্রোহী বিধায়কদের মূল ক্ষোভ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং তার ভাতিজা ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। তারা অভিষেককে পরবর্তী নেতা হিসেবে মেনে নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, অভিষেক এবং তার নির্বাচনী পরামর্শদাতা সংস্থা ‘আই-প্যাক’ মিলে তৃণমূলকে একটি কর্পোরেট সংস্থায় পরিণত করেছে, যার ফলে মাঠপর্যায়ের পুরনো কর্মীরা কোণঠাসা হয়েছেন। প্রবীণ নেতাদের মতে, মমতার অন্ধ ‘পরিবারতন্ত্র’ প্রীতির কারণে অভিষেক দলের ভেতরে সমান্তরাল ক্ষমতা বলয় তৈরি করে সব সিদ্ধান্ত ও টিকিট বণ্টন নিজের কার্যালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেন, যা দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নষ্ট করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পেছনে বেশ কিছু বড় কারণ রয়েছে:
জোটহীনতা: ‘ইন্ডিয়া জোটে’ না গিয়ে একা লড়ার কারণে বিরোধী vote ভাগ হয়ে গেছে, যার সরাসরি ফায়দা তুলেছে বিজেপি।
ভোট ব্যাংক ভাঙন: এবার ‘ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট’ ও হুমায়ুন কবীরের ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ মুসলিম ভোট নিজেদের দিকে নিতে সফল হয়েছে। বিপরীতে, ৬০-৬৫ শতাংশ বা তারও বেশি হিন্দু ভোট পেয়েছে বিজেপি।
ভোটার তালিকা সংশোধন: ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) ফলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে ৯০ লাখেরও বেশি নাম বাদ পড়েছে, তাতে তৃণমূলই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্নীতি ও অপশাসন: দীর্ঘ ১৫ বছরের দুর্নীতি, কাটমানি এবং ‘সিন্ডিকেট রাজ’ মমতার ‘সততার প্রতীক’ ভাবমূর্তি ধ্বংস করেছে। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা এবং ভোটের আগে চালু করা মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতাও ভোটারদের ক্ষোভ প্রশমন করতে পারেনি।
এই সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়াতে মমতাকে কঠোর সাংগঠনিক রদবদলের মাধ্যমে দলের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় স্তরে ‘ইন্ডিয়া জোটে’ প্রত্যাবর্তন, নতুন করে গণআন্দোলন গড়ে তোলা, দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের ছাঁটাই এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির তরুণদের নেতৃত্বে প্রাধান্য দিতে হবে। সূত্র: এনডিটিভি, বিবিসি বাংলা, এবিপি
উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং
ইরানের রাডার স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা