পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরের কৃষক রমেশ কুমার (৪২) বর্তমানে এক গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। নিজের গম ক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে তিনি বারবার হিসাব মেলাচ্ছেন- সারের দাম কত বাড়ল, এবার ফলন কেমন হবে আর বাজারে সারের দামই বা কত জুটবে। কিন্তু তার এই হিসাব কেবল চাষবাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সাথে জড়িয়ে আছে তার ১২ বছর বয়সী ছেলের স্কুলের বেতন, ঋণের কিস্তি এবং মেয়ে বর্ষার বিয়ের জন্য জমানো টাকা।
রমেশ কুমারের দীর্ঘশ্বাস, “আমি জানি না এবার মেয়ের বিয়েটা দিতে পারব কি না। আমাদের সবকিছুই এখন ফসলের ওপর নির্ভর করছে।”
এই অনিশ্চয়তা কেবল রমেশের একার নয়। কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েক কোটি কৃষকের ঘরে অভাবের ছায়া ফেলেছে। সারের দুষ্প্রাপ্যতা এবং উচ্চমূল্য কৃষকদের বাধ্য করছে অত্যন্ত কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু নৌপথটি বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) অন্যতম প্রধান পথ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলার পর ইরান এই পথটি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের মোট উৎপাদিত সারের একটি বড় অংশ নাইট্রোজেন-ভিত্তিক, যা তৈরিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন হয়। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে এই গ্যাস ও সার এশিয়ায় আসার প্রধান পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
পরিবহন খরচ ও বীমা ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সারের বাজারে আগুন লেগেছে। দক্ষিণ এশিয়া, যেখানে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বসবাস, সেখানে খাদ্যের চাহিদা মেটাতে সার-নিবিড় কৃষির ওপর নির্ভর করতে হয়। এই অঞ্চলে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের বিশাল এক জনগোষ্ঠী কৃষির সাথে সরাসরি যুক্ত।
দেশভিত্তিক প্রভাবের চিত্র
ভারত: ভারতের প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারের কৃষি খাত ১০ কোটিরও বেশি কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। ভারতের প্রয়োজনীয় সারের কাঁচামাল এবং ফসফেট ও পটাশের প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে এই হরমুজ প্রণালী হয়ে। যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংসদে আশ্বস্ত করেছেন যে গ্রীষ্মকালীন বপন মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সারের ব্যবস্থা রয়েছে এবং ভারত ‘ন্যানো ইউরিয়া’ ও ‘প্রাকৃতিক চাষে’র দিকে ঝুঁকছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। কাশ্মীরের সরিষা চাষি গোলাম রসুল আল জাজিরাকে জানান, সারের সংকট হওয়ার আগেই বাজারে দাম বেড়ে গেছে। খরচ বাঁচাতে তারা সারের ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ফলনের ওপর।
পাকিস্তান: পাকিস্তানের জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। দেশটির ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (DAP) সারের আমদানির ২৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া ইউরিয়া তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় উৎপাদন খরচও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। দক্ষিণ পাঞ্জাবের কৃষক মুনীর আহমেদ বলেন, “আমাদের ওপর আগে থেকেই ঋণের বোঝা। সারের দাম বাড়লে আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।”
বাংলাদেশ: বাংলাদেশের কৃষি খাত জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ জোগান দেয়। বাংলাদেশের আমদানিকৃত সারের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সরকার বিকল্প হিসেবে চীন ও মরক্কো থেকে সার আমদানির চেষ্টা করছে এবং ৫ লক্ষ টন ইউরিয়া সংগ্রহের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে রংপুরের কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, সার এখন ‘সোনার হরিণ’। কখনো পাওয়া যায়, কখনো যায় না; আর পাওয়া গেলেও দাম থাকে নাগালের বাইরে।
নেপাল: ভূমিবেষ্টিত দেশ নেপাল তাদের সারের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে মেটায়। নেপালের কৃষি মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি রামকৃষ্ণ শ্রেষ্ঠ সতর্ক করেছেন যে, শিপমেন্ট বিলম্বিত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে ধান চাষে বড় ধরনের বিপর্যয় আসতে পারে। সরকার এখন কৃষকদের রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার ও কম্পোস্ট ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে।
বিপন্ন জীবন ও খাদ্য নিরাপত্তা
সারের এই সংকট কেবল কৃষকের আয় কমাবে এমন নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবারগুলো তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। ফসলের উৎপাদন কমলে চাল, গম ও সবজির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
কৃষকদের কাছে এই যুদ্ধ কোনো দূরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক খেলা নয়; এটি তাদের সন্তানদের শিক্ষা, পরিবারের আহার এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নভঙ্গের কারণ। ভারতের পাঞ্জাব থেকে বাংলাদেশের রংপুর- সর্বত্র একই হাহাকার। বিশ্বনেতাদের যুদ্ধের ডামাডোলে পিষ্ট হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সেই মানুষগুলো, যারা সারা বিশ্বের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেয়।
রমেশ কুমার যখন তার ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘অন্যদের কাছে এটা যুদ্ধ, কিন্তু আমাদের কাছে এটা পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই,’ তখন তা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার এক চরম নিষ্ঠুরতা বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে।
সূত্র: আলজাজিরা