দক্ষিণ কোরিয়ায় টানা কয়েক সপ্তাহের ভয়াবহ দাবদাহে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে দেশটির কৃষি খাতেও নেমে এসেছে বড় বিপর্যয়। অনেক এলাকায় জমি থেকে তোলার আগেই মাটির নিচে আলু নরম হয়ে পচে যাচ্ছে। দেখতে অনেকটা সেদ্ধ আলুর মতো হয়ে যাওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা।
দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য প্রদেশ গ্যাংওনের কৃষকেরা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও অনেক আলুখেত স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল। কিন্তু এখন ফসল তুলতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু জমির আলু আগেই নষ্ট হয়ে গেছে।
উত্তর কোরিয়ার সীমান্তসংলগ্ন ইয়াংগু কাউন্টির হেয়ান এলাকার আলুচাষি লি সাং-হিয়ক স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে বলেন, চার দশক ধরে কৃষিকাজ করলেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি আগে কখনো হননি। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু একটি বা দুটি জমির সমস্যা নয়; পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রকাশ করার মতো ভাষাও তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।
আলুর পাশাপাশি তীব্র গরমে গ্যাংওনের কয়েক হাজার পিয়ং জমিতে উৎপাদিত বাঁধাকপিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকেরা ফসল সংগ্রহে কিছুটা দেরি করেছিলেন। এর মধ্যেই প্রচণ্ড তাপে জমিতেই বাঁধাকপি পুড়ে ও পচে যায়। এতে কৃষকদের কয়েক কোটি কোরীয় ওনের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
৪২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড
তীব্র দাবদাহের প্রভাব শুধু কৃষিতে সীমাবদ্ধ নেই; মানুষের জীবনেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দাবদাহে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে পালন করা প্রায় ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে।
গত ২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইয়াংসান শহরে তাপমাত্রা বেড়ে ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ১৯০৪ সালে আধুনিক পদ্ধতিতে তাপমাত্রা রেকর্ড শুরু হওয়ার পর এটিই দক্ষিণ কোরিয়ায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড।
প্রচণ্ড গরমে কৃষকেরাও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন। কিন্তু ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে ঘরে থাকার সরকারি পরামর্শ মানা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির নতুন ইঙ্গিত
গবেষকেরা এর আগেই আলুকে অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল ফসল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ২০২৪ সালে Potato Research সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রীষ্মকালীন আলু চাষে তাপসহনশীল জাতের প্রয়োজন হতে পারে। বসন্তকালীন আলু তুলনামূলক আগে রোপণ করলেও কিছুটা সুফল পাওয়া সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এশিয়াজুড়ে বাড়তে থাকা চরম তাপপ্রবাহেরও একটি উদাহরণ। জাপানের কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি উঠেছে। হংকংয়ে তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা সেখানে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর সর্বোচ্চ। অন্যদিকে চীনের শিনচিয়াংয়ের একটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে জুলাই মাসে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাও রেকর্ড হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ‘এশিয়ার জলবায়ুর অবস্থা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩৫ বছরে এশিয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার তার আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার জমির নিচে আলু নরম হয়ে ‘সিদ্ধ’ হওয়ার ঘটনা শুধু একটি দেশের কৃষি বিপর্যয়ের চিত্র নয়; এটি এশিয়ায় দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠা চরম তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।