আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ কান্দাহারে এবার আঙুরের ফলন হয়েছে দারুণ। কিন্তু সেই সুখবর কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে পারছে না। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের জেরে সীমান্ত বন্ধ থাকায় তাদের প্রধান রপ্তানি বাজারই এখন হাতের নাগালের বাইরে।
কয়েক মাস ধরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে থেমে থেমে গোলাগুলি চলছে, যাতে ইতিমধ্যে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ইসলামাবাদের অভিযোগ, তালেবান সরকার পাকিস্তানে হামলাকারী জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে-যা কাবুল সরাসরি অস্বীকার করে আসছে। এই উত্তেজনার জেরেই বন্ধ হয়ে গেছে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ, যা দিয়ে আফগান পণ্যের সিংহভাগ রপ্তানি হতো।
তাজা আঙুর বাইরে পাঠাতে না পেরে কৃষকরা এখন বাধ্য হয়ে দেশীয় বাজারেই মাল ছাড়ছেন। ফলে সরবরাহ বেড়ে দাম পড়ে গেছে হুহু করে। বিকল্প হিসেবে অনেকে আঙুর শুকিয়ে কিশমিশ বানানোর পথ বেছে নিয়েছেন, যদিও তাতে লাভ আসছে সামান্যই।
কান্দাহারের জারি জেলার এক গুদামঘরে গিয়ে দেখা যায়, মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে সমানে, আর সারি সারি কাঠির ওপর ঝুলছে সবুজ, রসাল আঙুরের থোকা-রোদে-হাওয়ায় শুকিয়ে কিশমিশ হওয়ার অপেক্ষায়।
কিন্তু কিশমিশের বাজারও এখন মন্দার কবলে। জারিতে নিজের আঙুরবাগান আছে সাখি জানের। দশজনের সংসার চালাতে তার এখন হিমশিম অবস্থা। তিনি জানান, আগে সাত কেজি কিশমিশ বিক্রি হতো ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ আফগানিতে, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ১৩ থেকে ১৬ ডলারের সমান। এখন সেই একই পরিমাণ কিশমিশ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ আফগানিতে, অর্থাৎ ৫ থেকে ৬ ডলারে।
আফগানিস্তানের মতো দরিদ্র ও অপুষ্টিপীড়িত দেশে আয়ের এই ধস মানুষের জীবনে সরাসরি আঘাত হানছে। জান বলেন, ‘আমরা কৃতজ্ঞ যে এখনও কিছু কাজ পাচ্ছি, কিন্তু আগের মতো আর কিছু নেই। লড়াইটা এখন অনেক কঠিন।’ তার ভাষায়, ‘আগে কাজের অভাব ছিল না, আঙুর বিক্রি হতো নিয়মিত, মানুষের হাতেও কাজ ছিল। এখন সেই কষ্ট চরমে পৌঁছেছে।’ দুই দেশের সরকারকে দ্রুত সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কান্দাহার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের উপ-পরিচালক আবদুল বাকি বিনা বলেন, সীমান্ত বন্ধ হওয়ায় শুধু আঙুর নয়, ডালিম রপ্তানিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। তার তথ্যমতে, ২০২৫ সালে আফগানিস্তানের প্রধান আঙুর উৎপাদনকারী পাঁচটি দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ থেকে ৪৪ হাজার ২২৫ টন আঙুর রপ্তানি হয়েছিল, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। এর মধ্যে প্রায় পুরোটাই-৪৩ হাজার টন-গিয়েছিল পাকিস্তানে, বাকিটুকু বাংলাদেশ, ইরাক ও ভারতে। অথচ চলতি বছর এখন পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২৫৬ টন, যার মূল্য এক লাখ ডলারও ছাড়ায়নি।
আঙুর রপ্তানিকারক হাজি আবদুল হাইয়ের কাছে পরিস্থিতিটা রীতিমতো বিপর্যয়ের মতো। তিনি বলেন, ‘৫০ বছরের জীবনে এমন বন্ধ সীমান্ত আমি কখনও দেখিনি।’ আগে সীমান্ত বন্ধ থাকলেও তা কয়েক দিনের মধ্যে খুলে যেত, কিংবা একটি পথ বন্ধ থাকলে অন্যটি খোলা থাকত-এমনটাই জানান তিনি। তার কথায়, ‘কিন্তু এবার সত্যিকারের সংকটে পড়েছি আমরা।’
গত বছর যে বাগানে কুদরাতুল্লাহ পোপাল আঙুর তুলতেন, সেখানে কাজ করতেন প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক। এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৫ জনে। তিনি বলেন, ‘ফলন খারাপ হয়নি, আঙুরও ভালো হয়েছে। সমস্যা হলো, তা অন্য দেশে পাঠানো যাচ্ছে না। সব যাচ্ছে দেশের ভেতরেই, যেখানে এমনিতেই আঙুরের ছড়াছড়ি।’ পোপালের ভাষায়, ‘বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে গেলে থমকে যায় সবার জীবিকা, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, বাগানমালিক, সবাই একসঙ্গে সংকটে পড়ে।’