পাকিস্তানে বৃষ্টির পূর্বাভাস এখন অনেকটা রাশিয়ান রুলেত খেলার মতো, পূর্বাভাস আছে, প্রযুক্তি আছে, সতর্কবার্তাও আছে; কিন্তু বিপদ কখন, কোথায় এবং কতটা ভয়াবহ হয়ে আসবে, তা জানার আগেই অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। পাকিস্তানে মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি বাড়লেও দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা যথাসময়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। দেশটির আবহাওয়া পূর্বাভাসব্যবস্থায় সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি পূর্বাভাসদাতাদের মধ্যে মতবিরোধ, তথ্য পৌঁছে দেওয়ার দুর্বলতা এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
এর ভয়াবহ উদাহরণ বুনেরের শিক্ষক সুলাইমানের পরিবার। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে স্বাভাবিক বৃষ্টির মধ্যেই মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে পাহাড়ঘেরা এলাকায় নেমে আসে ভয়াবহ মেঘভাঙা বৃষ্টি। শ্রেণিকক্ষের জানালা থেকে সুলাইমান দেখতে পান, স্বচ্ছ পানির ছোট একটি ঝরনা মুহূর্তেই কাদামাটির স্রোতে পরিণত হয়েছে। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, গাড়ি ও পালিয়ে যাওয়া মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেই স্রোত।
সুলাইমান দ্রুত ফোন করেন ৩৩ কক্ষের পারিবারিক বাড়িতে থাকা ভাইকে। ফোন ধরলেও কথা বলার আগেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ওই ঘটনায় পরিবারের ২৭ সদস্যের মধ্যে ২৪ জনই মারা যান। পুরো একটি বংশের বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপ থেকে শেষ মরদেহটি উদ্ধার করতেও এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগে।
সুলাইমানের আক্ষেপ, মাত্র ৩০ মিনিট আগেও যদি স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হতো, অনেকেই পাহাড়ের উঁচু এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিতে পারতেন। প্রায় এক বছর পরও বুনেরের ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ হলেও পাথর ও ধ্বংসাবশেষে ভরা পড়ে আছে অনেক এলাকা। নষ্ট হয়ে যাওয়া ভুট্টা ও গমের ক্ষেতও পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা যায়নি। আর ঝড়ের কালো মেঘ দেখলেই অনেক শিশুর মধ্যে ফিরে আসে সেই ভয়াবহ দিনের আতঙ্ক।
তথ্য আছে, পৌঁছায় না মানুষের কাছে
দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ফাতিমা ইয়ামিনের মতে, পাকিস্তানের মূল সমস্যা আবহাওয়ার তথ্যের ঘাটতি নয়; বরং সেই তথ্য কীভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
পাকিস্তান আবহাওয়া অধিদপ্তর আঞ্চলিক পর্যায়ে পূর্বাভাস তৈরি করে এবং বিভিন্ন সরকারি মাধ্যমে সতর্কবার্তা প্রকাশ করে। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম কিংবা বিদ্যুৎ ও যোগাযোগসুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষের কাছে এসব সতর্কবার্তা অনেক সময় পৌঁছায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয়াবহ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকলে শুধু টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা প্রকাশ করলেই যথেষ্ট নয়। স্থানীয় ভাষায় মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো, স্থানীয় বেতারে প্রচার, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে সতর্কবার্তা দেওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সরাসরি সক্রিয় করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কারণ একজন সাধারণ মানুষ জানতে চান, আগামী এক ঘণ্টায় তার বাড়ির সামনে পানি উঠবে কি না, আবহাওয়ার জটিল বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নয়।
প্রযুক্তি আছে, তবু পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তা
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান মাত্র নয়টি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমানে দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তরের শতাধিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে তাপমাত্রা, বাতাসের গতি ও দিক, বায়ুচাপ, মাটির তাপমাত্রা, ঘণ্টাভিত্তিক বৃষ্টিপাত ও মেঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
আকাশের ওপরের স্তরের তথ্য সংগ্রহে হিলিয়ামভর্তি বেলুন ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ডপলার রাডার, ভূস্থির ও মেরু-কক্ষপথের উপগ্রহ এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণকারী যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য কম্পিউটারভিত্তিক আবহাওয়া মডেলে বিশ্লেষণ করা হয়।
তারপরও আবহাওয়ার পূর্বাভাস শতভাগ নির্ভুল হওয়া সম্ভব নয়। কারণ বায়ুমণ্ডল একটি অত্যন্ত জটিল ও অরৈখিক ব্যবস্থা। শুরুতে সামান্য ভুল তথ্য ঢুকে পড়লেও সময়ের সঙ্গে সেই ভুলের মাত্রা বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার স্বল্পমেয়াদি পূর্বাভাস সাধারণত তুলনামূলকভাবে নির্ভুল। কিন্তু তিন থেকে সাত দিনের পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তা বাড়ে। ১৫ দিন থেকে তিন মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে নির্ভুলতা আরও কমে যায়। পাকিস্তানের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও স্থানীয় জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন এই সমস্যাকে আরও জটিল করে।
সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ
পাকিস্তানে সরকারি ব্যবস্থার বাইরে কিছু স্বাধীন আবহাওয়া পূর্বাভাসদাতাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাদের কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পূর্বাভাস দেন, কেউ আবার নিজস্ব আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন।
জাওয়াদ মেমন প্রায় ১৫ বছর আগে ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে আবহাওয়া নিয়ে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তার পূর্বাভাস বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলেও প্রচারিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলের তথ্য স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি পূর্বাভাস তৈরির চেষ্টা করেন এবং নিজের পূর্বাভাসের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাবও রাখেন।
অন্যদিকে ওয়েদারওয়ালে নামে একটি বেসরকারি উদ্যোগ পাকিস্তানজুড়ে প্রায় ৪০০টি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেল, উপগ্রহচিত্র ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণ একত্র করে প্রতিষ্ঠানটি পূর্বাভাস তৈরি করে এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সতর্কবার্তা পাঠায়।
তবে সরকারি আবহাওয়াবিদদের একাংশ বেসরকারি পূর্বাভাসদাতাদের নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা বাড়াতে কোনো কোনো বেসরকারি পেজ ঝড় বা বৃষ্টির সম্ভাবনাকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরে।
আবার সরকারি ব্যবস্থার সাবেক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, বেসরকারি পূর্বাভাসদাতাদের অভিজ্ঞতা ও দ্রুত যোগাযোগের সক্ষমতা সরকারি ব্যবস্থার দুর্বলতা পূরণে সহায়ক হতে পারে। তাদের মতে, প্রতিযোগিতার বদলে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা বাড়ানোই বেশি কার্যকর পথ।
শুধু পূর্বাভাস নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতাও দায়ী
পরিবেশ আইনজীবী আহমদ রাফায় আলমের মতে, দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির জন্য শুধু আবহাওয়া অধিদপ্তরকে দায়ী করলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়ালে থেকে যায়।
তার ভাষ্য, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে বিপুল তথ্য রয়েছে। কোন এলাকায় বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা খরার ঝুঁকি বেশি এবং কোন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এসব তথ্যও বিভিন্ন সরকারি মূল্যায়নে উঠে এসেছে। কিন্তু সেই তথ্য অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন কতটা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট। নদীর তীরবর্তী এলাকায় কোথায় নির্মাণ করা যাবে না, সে বিষয়ে আইন থাকার পরও বহু বছর ধরে সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। ফলে আকস্মিক বন্যা এলে শুধু পূর্বাভাস দিলেই মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয় না; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ ঠেকানো, স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় করা এবং দ্রুত মানুষকে সরিয়ে নেওয়াও জরুরি।
কেন নদীর তীরে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা বারবার তৈরি হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর আবহাওয়ার রাডারে পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দুর্বল আইন প্রয়োগ।
কয়েক মিনিটের সতর্কবার্তাই হতে পারে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য
বুনেরের সেই দিনের ঘটনা দেখিয়েছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সবচেয়ে বড় মূল্য তার বৈজ্ঞানিক নিখুঁততায় নয়, বরং সঠিক সময়ে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতায়।
সেদিন স্থানীয় বাসিন্দারা মৌসুমি বৃষ্টির সাধারণ পূর্বাভাস পেয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক কী ধরনের বিপদ আসছে, কত দ্রুত পানি বাড়তে পারে কিংবা কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, সে ধরনের নির্দিষ্ট সতর্কবার্তা তাদের কাছে পৌঁছায়নি।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকাজ চালানো সাংবাদিক সালিম খান দেখেছিলেন, কীভাবে একটি বাজার, গাড়ি, গবাদিপশু ও মানুষ মুহূর্তের মধ্যে স্রোতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে মরদেহের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছিল যে কাফনের কাপড় পর্যন্ত সংকট দেখা দেয়। মসজিদ থেকে ঘোষণা দেওয়ার পর মানুষ নিজেদের ঘর থেকে কাফনের কাপড় নিয়ে হাসপাতালে আসতে শুরু করেন।
পাকিস্তানের সামনে তাই প্রশ্নটি কেবল আরও উন্নত রাডার বা আরও শক্তিশালী কম্পিউটার কেনার নয়। প্রশ্ন হলো, যে তথ্য ইতোমধ্যেই রয়েছে, সেটি কীভাবে শেষ প্রান্তের মানুষটির হাতে পৌঁছানো যাবে।
সরকারি আবহাওয়া অধিদপ্তরের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, বেসরকারি পূর্বাভাসদাতাদের স্থানীয় পর্যবেক্ষণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতাকে এক কাঠামোয় আনতে না পারলে পূর্বাভাস থাকলেও প্রাণহানি ঠেকানো কঠিন হবে।
কারণ মেঘ কখন ভাঙবে, তা হয়তো সবসময় নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু বিপদ আসছে, এই বার্তাটি সময়মতো মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। আর সেই কয়েক মিনিটের ব্যবধানই অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। সূত্র: ডন