যশোরের বেনাপোল সীমান্তে কথিত অবৈধ পুশইনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তের শূন্যরেখায় গত তিনদিন ধরে কয়েকজন মানুষ আটকা পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খোলা আকাশের নিচে, রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সীমান্তসংলগ্ন ঝোপঝাড়ের মধ্যে অবস্থান করতে বাধ্য হওয়ায় তাদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানিয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে দাবি করে কোনো ধরনের প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় নিয়ম-নীতি বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সেই উদ্দেশ্যে তাদের সীমান্তের শূন্যরেখায় বসিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে আটকে থাকা ব্যক্তিরা যে বাংলাদেশি নাগরিক, এমন কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র, তথ্য বা নথি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। এ কারণে তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিজিবি। বাহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
এর আগে গত রোববার রাতে বেনাপোল সীমান্তের বিপরীতে ভারতের হরিদাসপুর এলাকায় তিনটি ট্রাকে করে শতাধিক মানুষকে জড়ো করা হয়। পরে তাদের বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান এবং বাড়তি সতর্কতার কারণে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বর্তমানে সীমান্তের ভারতীয় অংশে আরও শতাধিক মানুষকে অবস্থান করিয়ে রাখা হয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য অবৈধ পুশইনের আশঙ্কায় পুরো বেনাপোল সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে বিজিবি। সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, রাতের টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং নজরদারি কার্যক্রম শক্তিশালী করতে আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের একটি অংশ মনে করছে, সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ভবিষ্যতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হলে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা আরও সহজ হবে। তারা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত ও উচ্ছেদ কার্যক্রম জোরদার হওয়ার পর সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেও দৃশ্যমান। বিশেষ করে ভারতে জন্ম নেওয়া এবং দীর্ঘদিন সেখানে বসবাসকারী অনেক মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
এদিকে সীমান্তে আটকে থাকা মানুষদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত তাদের প্রকৃত পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, বিএসএফ যদি প্রচলিত নিয়ম-কানুন ও দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কাউকে ফেরত পাঠায়, তাহলে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের গ্রহণ করা হবে। কিন্তু কোনো ধরনের নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করে জোরপূর্বক কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্তে যাতে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ না ঘটে, সে জন্য অতিরিক্ত জনবল মোতায়েনসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বর্তমানে সীমান্তের পরিস্থিতি থমথমে থাকলেও উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সম্ভাব্য যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুরো সীমান্ত এলাকায় নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে।
শার্শা উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আক্তারুজ্জামান লিটু বলেন, সীমান্তে আটকে থাকা মানুষদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত তাদের প্রকৃত পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করে চলমান সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান করা প্রয়োজন।
৮ জুন নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে বিজিবি-বিএসএফ সীমান্ত সম্মেলন
চামড়া পাচার ও পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে বাড়তি নজরদারিতে বিজিবি