বাগেরহাটে খানজাহান আলীর (রহ.) মাজার-সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে নিহত ফাতেমার মা ফজিলা খাতুন তার পরিবারকে ফিরে পেয়েছেন। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগের কথা। এক ঝড়ের দিনে ছোট মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান মানসিক ভারসাম্যহীন ফজিলা খাতুন।
ময়মনসিংহ সদরের চর হরিচাঁদ গ্রাম থেকে নিখোঁজের পর হন্য হয়ে খুঁজেছে পরিবার। তাকে ফিরে পাওয়ার আশা একসময় ছেড়েও দিয়েছিল স্বজনরা। তবে বাগেরহাটে কুমিরের হামলায় ফাতেমার মৃত্যুর খবরই শেষ পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে ফজিলার পুনর্মিলনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ফজিলার পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে ঝড়-বৃষ্টির একদিন ছোট মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এদিকে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ফজিলা খাতুন তার মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে বাগেরহাটে হযরত খান জাহান (রহ.)-এর মাজার এলাকায় বসবাস করছিলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘ফাতেমার মা’ নামে। কেউই তার প্রকৃত পরিচয় জানতেন না।
গত সোমবার রাতে মাজার-সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের আক্রমণের শিকার হয় শিশু ফাতেমা। একদিন পর মঙ্গলবার ভোরে দিঘি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বুধবার সংশ্লিষ্ট কুমিরটিকেও দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ফাতেমার মৃত্যুর খবর ও ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বুধবার সেগুলো দেখে ফজিলার পরিবার। ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হয়, নিহত শিশুটি তাদের পরিবারের ফাতেমা এবং তার সঙ্গে থাকা নারীটি নিখোঁজ ফজিলা খাতুন। এরপরই পরিবারের সদস্যরা ময়মনসিংহ থেকে বাগেরহাটের উদ্দেশে রওনা দেন।
পরিবারের দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, নিহত ফাতেমার টিকাকার্ডসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে প্রশাসন ফজিলার পরিচয় নিশ্চিত করে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে মাজার এলাকায় পৌঁছে তারা ফজিলাকে খুঁজে পান। সন্তান হারানোর তিন দিন পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে খাবার খান তিনি। পরে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ফজিলার ভাই হারেজ আলী বলেন, সকালে এসে দেখি, আমার বোন মাজারের পূর্ব পাশে একটি ঘরের সঙ্গে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে উঠে বসে। পরে তাকে ফাতেমার কবরের কাছে নিয়ে যাই। তখন সে শুধু বলছিল, ‘কুমির আমার বাচ্চাকে খাইছে। কুমির আমারেও খাইয়া ফেলুক। আমি মেয়েকে ছেড়ে যাবো না।’
ফজিলার মা হাজেরা খাতুন বলেন, ‘আমার ছয় সন্তানের মধ্যে ফজিলা সবচেয়ে বড়। আমাকে দেখে সে বলছিল, ‘আমার মেয়েকে না দিলে আমি যামু না।’ নাতনির জন্য এখন আমার মন কাঁদে। ছোটবেলা থেকে আমিই তাকে মানুষ করেছি।’
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, পরিবারের দেওয়া তথ্য ও কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি ময়মনসিংহে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। সবকিছু যাচাইয়ের পর ফজিলা খাতুনকে তার পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে।