সরকারি বনাম প্রাইভেট প্রাথমিক শিক্ষা: আস্থার সংকট, দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি ও প্রাইভেট ধারার মধ্যে আস্থার প্রশ্নে একটি স্পষ্ট বৈষম্য তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অন্যদিকে প্রাইভেট স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন, এই দুই ধারার মধ্যে কাঠামোগত পার্থক্যের পাশাপাশি অভিভাবকদের আস্থা, শিক্ষার মান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কেও দৃশ্যমান ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

প্রাইভেট স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনের ক্ষেত্রে সীমিত বেতন ও সীমিত সম্পদের মধ্যেও অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার মান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের অনেক শিক্ষক মাসে তিন হাজার থেকে বারো হাজার টাকা বেতনে কাজ করেও নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের বোঝানো এবং অনুশীলনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই ধারাবাহিক পরিশ্রমের কারণে অভিভাবকদের মধ্যে একটি আস্থা তৈরি হয়েছে যে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। ফলে অনেক অভিভাবক মনে করেন, তাদের সন্তানের প্রাথমিক ভিত্তি গঠনে প্রাইভেট স্কুলগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

অন্যদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র অনেক জায়গায় ভিন্ন। এখানে শিক্ষকদের বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি আঠারো হাজার থেকে চল্লিশ হাজার টাকা বা তারও বেশি,তবুও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতায় নানা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানের ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ যত্নের অভাব এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগের ঘাটতি দেখা যায়। উদ্বেগজনকভাবে, কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত টিউশন বা প্রাইভেট পড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন। ফলে শিক্ষার্থীরা স্কুলের শিক্ষার চেয়ে প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

আরও একটি বাস্তবতা হলো, অনেক সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজের সন্তানদের প্রাইভেট স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করাতে আগ্রহী। অর্থাৎ যে ব্যবস্থার ভেতরে তারা দায়িত্ব পালন করছেন, সেই ব্যবস্থার ওপরই তারা পূর্ণ আস্থা রাখছেন না। এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও গভীর প্রশ্ন তৈরি করছে ,যে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নিজস্ব শিক্ষকরাই আস্থা রাখেন না, সেখানে অভিভাবকদের আস্থা কতটা টিকে থাকবে?

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত সুযোগ নিয়েও শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক শিক্ষার মান ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অথচ সরকারি ব্যবস্থায় দায়িত্ববোধ ও অগ্রাধিকারের জায়গায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে প্রাইভেট শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে, কারণ তারা অন্তত শ্রেণিকক্ষের ভিতরে একটি নিয়মিত শিক্ষার নিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছে।

শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, প্রাথমিক শিক্ষা যদি জাতির ভিত্তি হয়, তাহলে সেই ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই প্রভাবিত হবে। তাই দায় এড়ানোর সময় শেষ এখন প্রয়োজন দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সমস্যাগুলো স্বীকার করে নেওয়া। শ্রেণিকক্ষকে আবারও শিক্ষার মূল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে শিক্ষকতা হবে দায়িত্ব আর শিক্ষা হবে অগ্রাধিকার।

Attr/AHA
আরও পড়ুন