যে কারণে ২৩০০ আবেদন করেও চাকরি পাননি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি হোল্ডার

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

বিশ্বখ্যাত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাসায়নিক প্রকৌশলে পিএইচডি, রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন এবং বরফ গঠনের ওপর এমন গবেষণা, যা ২০২৪ সালে নোবেল কমিটির আলোচনায় মেশিন লার্নিংয়ের বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। এত যোগ্যতা থাকার পরও চাকরি পাচ্ছেন না যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর বয়সী জ্যাক ওয়েইস। পিএইচডি শেষ করার পর দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ২ হাজার ৩০০টির বেশি চাকরিতে আবেদন করেও স্থায়ী কর্মসংস্থান জোটেনি তাঁর।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের সল্ট লেক সিটির বাসিন্দা ওয়েইস এখন বাবা-মায়ের সঙ্গে নিজের শৈশবের বাড়িতে থাকছেন। পেশাগত জীবনের শুরুতে গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদে চাকরি খুঁজলেও পরে সফটওয়্যার প্রকৌশল থেকে শুরু করে হিমায়িত কাঁকড়ার কেক তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে খাবার প্রস্তুতের কাজের জন্যও আবেদন করেছেন তিনি।

ওয়েইস ২০১৮ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি প্রোগ্রামে যোগ দেন। এর আগে রাইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ একাডেমিক সম্মান সুমা কাম লাউডে নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া এবং অণুগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়া। বরফ কীভাবে গঠিত হয়, সে বিষয়ে তাঁর গবেষণা ২০২৪ সালে নোবেল কমিটির উপস্থাপিত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মেশিন লার্নিংয়ের প্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখিত হয়।

২০২৪ সালে ডক্টরেট শেষ করার পর তিনি প্রথমে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের গবেষণার পদ এবং জাতীয় গবেষণাগারগুলোর মর্যাদাপূর্ণ ফেলোশিপের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু বেশির ভাগ আবেদনের কোনো উত্তর পাননি, আর যেগুলোর উত্তর এসেছে, সেগুলোর অনেকই ছিল প্রত্যাখ্যান।

পরে নিজের বিশেষায়িত ক্ষেত্রের বাইরেও চাকরি খুঁজতে শুরু করেন ওয়েইস। বিভিন্ন শিল্পখাত ও ভৌগোলিক অবস্থানের প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাননি। প্রিন্সটন ও রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। কেউ কেউ তাঁকে শুধু প্রতিষ্ঠানের চাকরির ওয়েবসাইট নিয়মিত দেখতে পরামর্শ দিয়েছেন।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ওয়েইস একটি স্টার্টআপে খণ্ডকালীন কাজ পান। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সিস্টেম প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করত। কাজটির পারিশ্রমিক ছিল ঘণ্টায় ৭০ ডলার। তবে কাজের পরিমাণ নিয়মিত ছিল না।

কোনো সপ্তাহে তিনি ২০ ঘণ্টা কাজ করতেন, আবার কোনো সপ্তাহে কাজ নেমে আসত মাত্র চার ঘণ্টায়। পরে কাজের দায়িত্ব আরও কমতে থাকে। কখনো কখনো কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো কাজই পেতেন না তিনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চের মাঝামাঝি একটি গ্রুপ চ্যাটের মাধ্যমে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।

এরপর থেকে আবারও নতুন করে চাকরির সন্ধানে নেমেছেন ওয়েইস। এবার বিকল্প পেশার কথাও ভাবছেন তিনি। আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ল স্কুলে আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন এবং নভেম্বর মাসে ভর্তির পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টায় এআই-চালিত একটি ড্রোন তৈরি করছেন, যার লক্ষ্য কৃষিজমিতে ক্ষতিকর ও আগ্রাসী আগাছা অপসারণ করা।

ওয়েইসের বাবা-মা দুজনই চিকিৎসক। ছেলের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সাফল্যের পরও চাকরি পেতে এতটা সংগ্রাম করতে হচ্ছে—বিষয়টি তাঁদের বিস্মিত করেছে।

ছেলের চাকরির আবেদনপত্রগুলো পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য কোনো সমস্যা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর মা হলি কারভার্স। কিন্তু নিয়োগদাতাদের কাছে আবেদনগুলো গ্রহণযোগ্য না হওয়ার মতো কোনো স্পষ্ট কারণ তাঁর চোখে পড়েনি।

তিনি বলেন, “এটা সত্যিই অপ্রত্যাশিত। পরিস্থিতিটা কীভাবে ব্যাখ্যা করব, বুঝতে পারছি না।”

ওয়েইসের বাবা জন ওয়েইস বলেন, “আমি জীবনে কখনোই ভাবিনি, এই ছেলেটিকে চাকরি পেতে এমন সংগ্রাম করতে হবে।”

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সাংবাদিক লিন্ডসে এলিস যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের চাকরিপ্রার্থীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় ওয়েইসের ঘটনা সামনে আনেন। তাঁর মতে, ওয়েইসের অভিজ্ঞতা এমন একটি শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে, যেখানে নতুন নিয়োগের গতি কমে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চাকরির বাজারকে অনেক ক্ষেত্রে ‘কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই’-এর পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী কম নিয়োগ করছে, আবার বিদ্যমান কর্মীরাও তুলনামূলক কম হারে চাকরি ছাড়ছেন। ফলে নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য শূন্যপদ কমে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতা বাড়ছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ২৭ সপ্তাহ ধরে বেকার থাকা মানুষের অনুপাত প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে এ হিসাবের মধ্যে কোভিড-১৯ মহামারি ও তার অব্যবহিত পরবর্তী সময়কে ধরা হয়নি।

জ্যাক ওয়েইসের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, উচ্চশিক্ষা, গবেষণার স্বীকৃতি ও বিশেষায়িত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি পাওয়া নিশ্চিত নয়। নিয়োগ কমে যাওয়া, পদসংখ্যার সীমাবদ্ধতা এবং কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার চাহিদার পরিবর্তন যোগ্য প্রার্থীদেরও দীর্ঘদিন কর্মহীন রাখতে পারে। তবে একজনের অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো শ্রমবাজারের অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না; বরং এটি বৃহত্তর কর্মসংস্থান-সংকট বোঝার একটি উদাহরণ।

সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল; প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য ও বক্তব্য।

এএম
আরও পড়ুন