এখনো কাটেনি রহস্যের জট

সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৩ এএম

নব্বই দশকের ঢালিউডের ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী ৬ সেপ্টেম্বর (রোববার)। মাত্র ২৪ বছর বয়সে ১৯৯৬ সালের এইদিনে অকালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। 

রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার নিজ ফ্ল্যাটে সিলিংফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় সালমান শাহকে পাওয়া যায় বলে তার স্ত্রী সামিরা হক দাবি করেছিলেন। পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত হয়। যদিও সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারের অভিযোগ ছিল- এটি আত্মহত্যা নয়; পরিকল্পিত হত্যা। 

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় শাবনূরকেও দায়ী করা হয়। তদন্তের তথ্য এবং বর্তমান আইনি অবস্থান একসঙ্গে দেখলে উত্তরটি খুব সতর্কভাবেই দিতে হয়। শাবনূরের নাম এসেছে সালমান শাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন থেকে। বিভিন্ন ব্যক্তির অভিযোগ এবং ২০২০ সালের পিবিআই তদন্তের প্রসঙ্গে। পিবিআই তার সঙ্গে সালমানের সম্পর্ক এবং তা ঘিরে পারিবারিক বিরোধকে তদন্তের অংশ হিসাবে বিবেচনা করেছিল। অন্যদিকে সালমান শাহ মৃত্যুর আগে সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ্যে তাদের বিয়ের গুঞ্জন অস্বীকার করেছিলেন এবং শাবনূরকে ছোট বোনের মতো দেখেন বলে জানিয়েছিলেন। অভিনেত্রীও পরে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।

নব্বই দশকের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিলেন সালমান-শাবনূর। পর্দার জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সালমান শাহর মৃত্যুর পর শাবনূরের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নানা সময় নানা দাবি সামনে আসে। তবে এসব দাবির সঙ্গে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন; শাবনূর কখনো সালমান শাহর অপমৃত্যু কিংবা হত্যা মামলার আসামি ছিলেন না। অবশ্য পরে তাকে দায়ী করা হয়। 

২০২০ সালের পিবিআই তদন্তে শাবনূরের নাম আসে। তদন্তে সালমানের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। শাবনূরের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধও তদন্তের আলোচনায় আসে এবং সেটিকে আত্মহত্যার পেছনে থাকা সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে পিবিআইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন, তাকে হত্যা করা হয়নি। এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর শাবনূরও প্রকাশ্যে এর ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন।

এ বিষয়ে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর অস্ট্র্রেলিয়া থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাবনূর বলেছেন, সালমান শাহ আত্মহত্যা করলেও তার জন্য তিনি কেন দায়ী হবেন? তিনি সালমানকে নিজের ভালো সহশিল্পী হিসাবে বর্ণনা করেন এবং তাদের সম্পর্ক নিয়ে ছড়িয়ে পড়া নানা অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। 

এদিকে সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুমও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে শাবনূরের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নানা সময় সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেছেন, সালমানের মৃত্যুর পর শাবনূর কেন তার জানাজায় অংশ নেননি কিংবা সিলেটের বাসায় গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেননি, যা তাদের কাছে কষ্টের এবং প্রশ্নের বিষয় ছিল।

উল্লেখ্য, সালমান শাহর মৃত্যুর পর রমনা থানা পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করে এবং ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করে। এরপর পুলিশ, সিআইডি ও পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনাটি তদন্ত করে। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। সালমান শাহর বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন।

২০২০ সালে সালমান শাহর অপমৃত্যু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। 

তবে পিবিআইয়ের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন করেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়। এ হত্যা মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন- ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের মালিক রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ। সেই মামলায় সম্প্রতি পুলিশ ডনকে গ্রেপ্তার করেছে।

সেদিন যা ঘটেছিল : চিত্রনায়ক সালমান শাহ ওরফে শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন তখন থাকতেন রাজধানী ঢাকার নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার একটি ফ্ল্যাটে। সেদিন সকাল সাতটায় বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ছেলে ইমনের সঙ্গে দেখা করতে ইস্কাটনের বাসায় যান। কিন্তু ছেলের দেখা না পেয়ে তিনি ফিরে আসেন। সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেন, বাসার নিচে দারোয়ান সালমান শাহর বাবাকে ছেলের বাসায় যেতে দিচ্ছিলেন না। নীলা চৌধুরীর বর্ণনা ছিল এ রকম, ‘বলেছে স্যার এখন তো ওপরে যেতে পারবেন না। কিছু প্রবলেম আছে। আগে ম্যাডামকে (সালমান শাহর স্ত্রীকে) জিজ্ঞেস করতে হবে। একপর্যায়ে উনি (সালমান শাহর বাবা) জোর করে ওপরে গেছেন। কলবেল দেওয়ার পর দরজা খুলল সামিরা (সালমান শাহর স্ত্রী)। উনি (সালমান শাহর বাবা) সামিরাকে বলেন, “ইমনের (সালমান শাহর ডাকনাম) সঙ্গে কাজ আছে, ইনকাম ট্যাক্সের সই করাতে হবে। ওকে ডাক।” তখন সামিরা বলে, “ও তো ঘুমে।” তখন উনি বলেন, “ঠিক আছে আমি বেডরুমে গিয়ে সই করিয়ে আনি।” কিন্তু যেতে দেয়নি। আমার হাজব্যান্ড ঘণ্টা দেড়েক বসে ছিল ওখানে।’ 


বেলা ১১টার দিকে একটি ফোন আসে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর বাসায়। ওই টেলিফোনে বলা হলো, সালমান শাহকে দেখতে হলে তখনই যেতে হবে। টেলিফোন পেয়ে নীলা চৌধুরী দ্রুত ছেলে সালমান শাহর বাসার দিকে রওনা হয়েছিলেন। তবে সালমানের ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে ছেলে সালমান শাহকে বিছানার ওপর দেখতে পান নীলা চৌধুরী। এ বিষয়ে তার বক্তব্য ছিল, ‘খাটের মধ্যে যেদিকে মাথা দেওয়ার কথা, সেদিকে পা। আর যেদিকে পা দেওয়ার কথা সেদিকে মাথা। পাশেই সামিরার (সালমান শাহর স্ত্রী) এক আত্মীয়ের একটি পারলার ছিল। সেই পারলারের কিছু মেয়ে ইমনের হাতে-পায়ে শর্ষের তেল দিচ্ছে। আমি তো ভাবছি ফিট হয়ে গেছে। আমি দেখলাম, আমার ছেলের হাত-পায়ের নখগুলো নীল। তখন আমি আমার হাজব্যান্ডকে বলেছি, আমার ছেলে তো মরে যাচ্ছে।’
ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে বলা হয়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।

 

জেএম
আরও পড়ুন