হাজী মুহাম্মদ মুহসীনের জন্মদিন আজ

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৬ এএম

বাংলার ইতিহাসে দান, শিক্ষা ও মানবকল্যাণের কথা বললে যে নামটি নিঃশব্দে কিন্তু দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হয়, তিনি হাজী মুহাম্মদ মুহসীন। জন্মের দুই শতাধিক বছর পেরিয়ে গেলেও তার রেখে যাওয়া দানের ছাপ আজও রয়ে গেছে বাংলা ও বাঙালির শিক্ষা-সংস্কৃতিতে।

হাজী মুহাম্মদ মুহসীনের জন্ম হয়েছিল ১৮ শতকের প্রথম ভাগে, বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। ইতিহাসবিদদের মতে, তার জন্মসাল ১৭৩০ বা ১৭৩২। পারস্য থেকে আগত এক সম্ভ্রান্ত ও ধর্মপরায়ণ পরিবারের সন্তান মুহসীন শৈশব থেকেই দান, মানবিকতা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন।

অকৃতদার ও বৈষয়িক মোহহীন এই মানুষটি জীবনের বড় একটি সময় দেশ-বিদেশ ভ্রমণে কাটান। ভারত ছাড়াও তিনি মক্কা-মদিনা, কারবালা, নাজাফ, মিসর, তুরস্ক ও ইরান ভ্রমণ করেন। এসব ভ্রমণ তার চিন্তা-ভাবনাকে করে তোলে আরও উদার ও মানবিক।

বোন মরিয়ম খাতুন ওরফে মুন্নুজানের কাছ থেকে পাওয়া বিপুল জমিদারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত ভোগে নয়, তিনি ব্যয় করেন সমাজ ও মানুষের কল্যাণে। দুর্ভিক্ষের সময় খুলেছিলেন ‘জনতার রান্নাঘর’, নির্মাণ করেছেন মসজিদ, কূপ, পুকুর, রাস্তা ও বাজার। তবে তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল শিক্ষার প্রসারে।

১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর পর সমাজের পশ্চাৎপদতার মূল কারণ হিসেবে তিনি অশিক্ষাকেই দায়ী করেন। সে কারণেই তিনি তার সম্পত্তির আয়ের বড় অংশ শিক্ষা খাতে ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেন। ১৮০৬ সালে তিনি নিজের সমস্ত সম্পত্তি ওয়াকফ করে দেন এবং দানপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন-এই অর্থ ব্যয় হবে শিক্ষা, ধর্ম ও জনকল্যাণে।

১৮১২ সালে হাজী মুহাম্মদ মুহসীনের মৃত্যু হলেও তার দান থেমে থাকেনি। পরবর্তীতে ‘মহসিন এডুকেশনাল এনডাউমেন্ট ফান্ড’ গঠনের মাধ্যমে এই তহবিল থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় হুগলি মহসীন কলেজসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা- বাংলা জুড়ে গড়ে ওঠে স্কুল, মাদ্রাসা ও শিক্ষাবৃত্তি ব্যবস্থা।

এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দিজেন্দ্রলাল রায়সহ অসংখ্য কৃতী বাঙালি- যারা পরবর্তীতে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও সমাজচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে হাজী মুহাম্মদ মুহসীন ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ। মৃত্যুর আগে দান করা সম্পত্তি থেকে তিনি একটি টাকাও নিজের জন্য নেননি। কোরআন শরিফ হাতে লিখে কপি করে তার ব্যক্তিগত খরচ চালাতেন- যার একটি নিদর্শন আজও সংরক্ষিত আছে হুগলি ইমামবাড়ায়।

আজ তার জন্মদিনে দাঁড়িয়ে বলা যায়, হাজী মুহাম্মদ মুহসীন শুধু একজন দানবীর নন- তিনি বাংলার শিক্ষাজাগরণের এক নীরব স্থপতি। ইতিহাসে তার নাম হয়তো খুব জোরে উচ্চারিত হয় না, কিন্তু তার দানের আলোয় আজও আলোকিত অসংখ্য মানুষের জীবন।

AHA
আরও পড়ুন