বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস আজ

আপডেট : ৩১ মে ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

আজ ৩১ মে, ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’। তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। 

চলতি বছর দিবসটির আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আনমাস্কিং দ্য অ্যাপিল- কাউন্টারিং নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকো অ্যাডিকশন’ (Unmasking the appeal: countering nicotine and tobacco addiction)।

বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার এবং এর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বর্তমান জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪৮ শতাংশই তরুণ, আর এই তরুণ প্রজন্মই এখন তামাক কোম্পানিগুলোর প্রধান লক্ষ্য।

বাংলাদেশে তামাকের ভয়াবহ চিত্র: মৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতি

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার ও এর ক্ষতিকর প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক:

আক্রান্তের সংখ্যা: বর্তমানে দেশে প্রায় ৩.৭৮ কোটি মানুষ সরাসরি তামাক ব্যবহার করছেন।

মৃত্যুর হার: তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। দেশে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের প্রধান চারটি কারণের অন্যতম একটি তামাক।

অর্থনৈতিক ক্ষতি: ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এটি তামাক খাত থেকে সরকারের আহরিত রাজস্ব আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি।

চিকিৎসা ব্যয়: তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা।

তামাক চাষে জমির অপচয় ও পরিবেশ বিপর্যয়

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর ও কম আবাদযোগ্য জমির দেশ হওয়া সত্ত্বেও তামাক চাষে বিশ্বে ওপরের সারিতে রয়েছে।

শীর্ষ ১৩ নম্বরে বাংলাদেশ: বাংলাদেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৭ হাজার একর। অথচ তামাক চাষে ব্যবহৃত মোট জমির পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। বিশ্বের মোট তামাকের ১.৩ শতাংশ উৎপাদিত হয় এই বাংলাদেশে।

বন নিধন: ‘টোব্যাকো অ্যাটলাস’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৩১ শতাংশ বন উজাড় বা নিধনের পেছনে সরাসরি তামাক চাষ দায়ী।

জ্বালানি কাঠের অপচয়: গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার তিনটি উপজেলাতেই তামাকপাতা শুকানোর (কিউরিং) কাজে এক বছরেই প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হয়েছে।

কোম্পানিগুলোর কূটকৌশল ও কিশোরদের আসক্তি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, বিশ্বে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত ৩ কোটি ৭০ লাখ কিশোর-কিশোরী নিয়মিত তামাক ব্যবহার করে। এদেরকে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডে আসক্ত করতে তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কূটকৌশল অবলম্বন করছে:

আকর্ষণীয় সুগন্ধিযুক্ত (Flavored) তামাকপণ্য বাজারজাতকরণ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাকপণ্য সহজে লভ্য বা দৃশ্যমান করা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেলিব্রেটিদের দিয়ে পরোক্ষ প্রচার চালানো।

বিভিন্ন করপোরেট অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা (Sponsorship) প্রদান।

তামাক নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী আইন ও কর পদক্ষেপের বিরোধিতা করা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ (CDC)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ২১ বছর বয়সের আগেই তামাকে আসক্ত হয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে নিকোটিন নির্ভরতা ও আমৃত্যু তামাক ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও করণীয়

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘প্রজ্ঞা’র (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন:

"বাংলাদেশের বর্তমান মোট জনগোষ্ঠীর ৪৮ শতাংশই তরুণ-তরুণী এবং এরাই তামাক কোম্পানিগুলোর মূল টার্গেট। তামাক ও নিকোটিন আসক্তির ফাঁদ থেকে এই বিপুল তরুণ সমাজকে সুরক্ষায় ই-সিগারেট ও ভেপিংসহ নতুন প্রজন্মের সব ধরনের তামাকপণ্যের বিরুদ্ধে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।"

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে অনতিবিলম্বে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করা এবং কর বৃদ্ধির মাধ্যমে এর ব্যবহার কমিয়ে আনা জরুরি।

HN
আরও পড়ুন