আবারো বদলাচ্ছে পুলিশের পোশাক

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম

বিএনপি সরকার ক্ষমতা আসার পর থেকেই পুলিশের পোশাক ফের বদলানোর বিষয়টি সামনে আনে খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাই। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা হয়। এর প্রেক্ষিতে রঙ নির্ধারণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুলিশের ইউনিফর্মে গাঢ় নীল এবং হালকা অলিভ (জলপাই) রঙের সংমিশ্রণ ফিরে আসছে।

এ বিষয়ে পুলিশ ড্রেস রুলস, ২০২৫ সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।

সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিকস শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সারোয়ার জাহান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। চিঠিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, পূর্বে জারি করা এসআরও অনুযায়ী পুলিশের শার্ট গাঢ় ধূসর এবং প্যান্ট গাঢ় নীল থেকে পরিবর্তন করে শার্ট লোহার রঙ ও প্যান্ট কফি রঙ নির্ধারণ করা হয়। তবে মাঠপর্যায়ে এ পরিবর্তন নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং বিষয়টি নিয়ে বাহিনীর ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন রঙের নমুনা পর্যালোচনা করেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রাথমিকভাবে নতুন করে রঙ নির্বাচন করেন।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী- সব মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য শার্টের রং হবে হালকা অলিভ (জলপাই) রঙের। এপিবিএন, এসপিবিএন, এসবি, সিআইডি ও র‍্যাব ছাড়া অন্যান্য ইউনিটের জন্য শার্টের রং হবে গাঢ় নীল। উভয় ক্ষেত্রেই প্যান্টের রং নির্ধারণ করা হয়েছে টিসি টুইল খাকি রঙ। এই পরিবর্তন কার্যকর করতে পুলিশ ড্রেস রুলস, ২০২৫-এর একাধিক বিধি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন জারির জন্য একটি খসড়া এরইমধ্যে পাঠানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর চিঠি

যোগাযোগ করা হলে তিনি খবর সংযোগকে বলেন, পরিবর্তিত পোশাক নিয়ে বাহিনীর ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। নতুন পোশাকের দাবির বিষয়টি আমলে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নমুনা ও কালার বাংলাদেশ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ পর্যালোচনা করে কয়েকটি নমুনা নির্ধারণ করা হয়। সেটি বাস্তাবায়নে বিধি সংশোধন প্রয়োজন। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিধি সংশোধনের জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে।

কবে নাগাদ পোশাক পরিবর্তন হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করছে। বিধি সংশোধণের পর এটা দ্রুতই করা যাবে।

অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা খবর সংযোগকে বলেন, আমরা চেয়েছিলাম পুলিশ সপ্তাহের আগেই পোশাক বদলানো নিশ্চিত করতে। মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দেয়া হয়েছে। বিধি সংশোধন হয়ে গেছে এটা দ্রুতই কার্যকর করা সম্ভব। কারণ প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ইউনিফর্ম সরবরাহ করে থাকে পুলিশ। সুতরাং পুলিশের ইউনিফর্মের রং পরিবর্তনের জন্য সরকারের অতিরিক্ত কোন আর্থিক খরচের চাপ থাকছে না। এখন সরকারের সিদ্ধান্ত।

এখানে উল্লেখ্য যে, বদলে যাওয়া পোশাক নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যের অস্বস্তির বিষয়টি নতুনভাবে সামনে আসে গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরই। চাউর করা হয় যে, নতুন পোশাকের পরিবর্তন চাচ্ছেন তারা। পুলিশ সদস্যরা বলছেন, তারা পুরনো পোশাকে ফিরতে চান। বর্তমান পোশাকের রঙ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এই পোশাক নিয়ে ব্যঙ্গ করেন। এতে পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্য অস্বস্তি বোধ করছেন বলেও প্রচার পায়।

এর মধ্যেই গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আনে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। পুলিশের এ সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যই তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই পরিবর্তনের পক্ষে নন। বরং তারা বর্তমানে পরিহিত পোশাকটিকে বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের প্রতীক হিসেবে মনে করেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অন্তবর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশ পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করে যে নতুন পোশাক নির্বাচন করেন, সেখানে পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং, আবহাওয়া এবং পুলিশ সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করেই কোনরূপ জনমত যাচাই-বাছাই ছাড়া পোশাক নির্বাচন করেন। অন্য যে সকল সংস্থা ইউনিফরম পরে থাকেন তাদের সঙ্গে হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে। এতে পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের খাকি যে পোশাকটি ছিলো তা ২০০৩-২০০৪ সালের তৎকালীন সরকার একটি গঠিত কমিটির মাধ্যমে দীর্ঘ যাচাই বাছাই শেষে বাংলাদেশের পুলিশের চাকুরিতে কর্মরত ব্যক্তিদের গায়ের রং, আবহাওয়া, রাত্রি ও দিনের ডিউটিতে সহসায় চিহ্নিত করা যায় এবং অন্য যে কোন বাহিনীর সঙ্গে যেনো সাদৃশ্য না হয় এসব বিষয় বিবেচনা করেই নির্ধারণ করেছিল।

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়শেন বলছে, পোশাক পরিবর্তন একটি বিশাল ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। যা বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন মনে করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নতুন পোশাক তৈরির পরিবর্তে বাহিনীর আধুনিকায়ন, থানা পর্যায়ে যানবাহন সরবরাহ ও লজিস্টিকস সাপোর্ট বৃদ্ধি করাই অধিক যুক্তিযুক্ত হবে। পোশাকের রঙ বা নকশা নয় বরং পুলিশ সদস্যদের মন মানসিকতার পরিবর্তন, মনোবল এবং পেশাদারিত্বের উন্নয়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি সদস্য এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সে সময় জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আনিসুজ্জামান বলেছিলেন, পোশাক বদলের বিষয়টি বিবেচনা করতে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করব। এর আগে যে পোশাক আমরা পড়তাম সেটিতে ফেরত যেতে পারি। এছাড়া কর্তৃপক্ষ চাইলে সবার মতামতের ভিত্তিতে অন্য কোনও পোশাক দিতে পারে। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়শন থেকে আমরা পোশাক বদলের উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে সোচ্চার থাকব।

উল্লেখ্য যে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়ন ও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশকে ট্রমা কাটিয়ে কর্মচাঞ্চল্যে ফেরাতে পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ, র‍্যাব ও অঙ্গীভূত আনসারের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। গত বছরের জানুয়ারিতে এই তিন বাহিনীর জন্য নতুন পোশাক ঠিক করা হয়। তখন সমালোচনা হলে র‍্যাব ও অঙ্গীভূত আনসারের পোশাকে আর পরিবর্তন আনা হয়নি।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশসহ (ডিএমপি) দেশের সব মহানগর পুলিশ ও বিশেষায়িত ইউনিটে নতুন পোশাক পরিধান শুরু করে।

YA
আরও পড়ুন