দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতির বিষয়ে ইসলাম কী বলে?

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৯ এএম

বিয়ে শুধু দুজন মানুষের সামাজিক বন্ধন নয়; এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, আস্থা ও আমানতের এক পবিত্র সম্পর্ক। একজন স্ত্রী তার স্বামীর জীবনে শুধু সঙ্গী নন— তিনি তার স্বপ্ন, কষ্ট, আশা ও নির্ভরতার অংশ।

তাই দ্বিতীয় বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথম স্ত্রীর অনুভূতি, সম্মান ও মানসিক নিরাপত্তার প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তাই এই সংবেদনশীল বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের জন্য স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইসলাম কি একাধিক বিয়ের অনুমতি দেয়?

আল্লাহ তাআলা শর্তসাপেক্ষে একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বিষয়টি এভাবে উপস্থাপন করেছেন— 

‘তোমাদের কাছে নারীদের মধ্যে যারা ভালো লাগে, তাদের মধ্য থেকে দুই, তিন অথবা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা কর যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না—তবে একজনই যথেষ্ট।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩)

কুরআনুল কারিমের এই আয়াত সুস্পষ্ট করে দেয় যে, দ্বিতীয় বিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নয়; বরং এটি একটি অনুমতি, যা ন্যায়বিচারের কঠোর শর্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি ফরজ?

‘না’, দ্বিতীয় বিয়ে করতে পুরুষের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ফরজ নয়। কেননা কুরআন ও হাদিসের কোথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়নি যে, দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ফরজ বা শর্ত। তাই কেউ যদি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করে তবে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে আইনগতভাবে বৈধ।

তবে ইসলামের শিক্ষা এখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে যে দায়িত্ব/শর্ত বা বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে—

ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব— মূল শর্ত

একাধিক বিয়ের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ন্যায়বিচার। শুধু ভরণপোষণ নয়, বরং সময়, দায়িত্ব, আচরণ ও মর্যাদার ক্ষেত্রেও ন্যায়পরায়ণতা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘তোমরা নারীদের মধ্যে পুরোপুরি ন্যায়বিচার করতে কখনোই সক্ষম হবে না, যদিও তোমরা চেষ্টা কর।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১২৯)

এই আয়াত মানুষকে সতর্ক করে দেয়— ন্যায়বিচার করা কতটা কঠিন। তাই যার মধ্যে এই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা নেই, তার জন্য একাধিক বিয়ের পথে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

স্ত্রীর অনুভূতি ও সম্মান: সুন্নাহর শিক্ষা

যদিও প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ফরজ নয়, তবে তার অনুভূতির প্রতি সম্মান ও ন্যায়পরায়ণ আচরণ করা সুন্নাহ ও উত্তম চরিত্রের অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি ৩৮৯৫)

এই হাদিস প্রমাণ করে—স্ত্রীর প্রতি দয়া, সম্মান ও ন্যায্যতা ঈমান ও চরিত্রের পরিচয়।

গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে— ইসলাম কী বলে?

গোপনে বিয়ে করা শরিয়তের দৃষ্টিতে তখনই অবৈধ হবে, যদি—

বিবাহের মৌলিক শর্ত (ইজাব-কবুল, সাক্ষী, মহর) পূরণ না হয়
বা প্রথম স্ত্রীর হক নষ্ট হয় তবে বাস্তবতায় গোপন বিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই—

অন্যায় অবিচার পারিবারিক ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা ইসলাম সমর্থন করে না। নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের জায়গা ইসলাম কেবল বৈধতা শেখায় না; বরং দায়িত্ববোধও শেখায়।

প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ফরজ না হলেও— তাকে জানানো তার কষ্ট বোঝা ন্যায্যতা নিশ্চিত করা— এসবই তাকওয়া ও উত্তম আচরণের অংশ। হজরত ওমর (রা.) বলতেন— ‘ন্যায়বিচারই শাসন ও সম্পর্কের মূল ভিত্তি।’

দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শরিয়তের দৃষ্টিতে ফরজ নয়—এটি সত্য। তবে এটাও সত্য যে, ইসলামের শিক্ষা শুধু আইনি বৈধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তা করবে, তার উচিত—

নিজের সক্ষমতা যাচাই করা আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা মনে রাখা প্রথম স্ত্রীর হক ও অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো কারণ একদিন আল্লাহর সামনে শুধু বিয়ের বৈধতা নয়— ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব পালনের হিসাবও দিতে হবে। 

HN
আরও পড়ুন