ঢাকা
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪৩২
ই-পেপার

 ক্ষমা সবচেয়ে মধুর প্রতিশোধ 

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:১০ এএম

জীবনে অপমান, কষ্ট, অবহেলা— এসবের মুখোমুখি হওয়া যেন অবধারিত। কারও একটি আচরণ, একটি কটু বাক্য বা একটি ভুল আমাদের হৃদয়ে দাগ কাটে। তখন মন চায় প্রতিশোধ নিতে, বদলা দিতে। কিন্তু প্রতিশোধ সবসময় ক্ষত সারায় না; বরং ক্ষতকে আরও গভীর করে। কিন্তু এমন এক প্রতিশোধ আছে, যা আঘাত না দিয়ে আরোগ্য দেয়, ঘৃণা না বাড়িয়ে হৃদয়কে প্রশান্ত করে— আর সেটি হলো ক্ষমা।

ক্ষমা শুধু এক ধরনের আচরণ নয়; এটি হৃদয়ের মহত্ত্ব, ঈমানের আলো এবং চরিত্রের সর্বোচ্চ সৌন্দর্য। ক্ষমাই মানুষকে সবচেয়ে বড় বিজয়ী করে তোলে। তাই তো বলা হয়— ‘সবচেয়ে মধুর প্রতিশোধ হলো ক্ষমা।’

কুরআনে ক্ষমার মর্যাদা

 

১. ক্ষমা শক্তির পরিচয়

দুনিয়ায় যে ক্ষমা করে, তার পুরস্কার আল্লাহ নিজ হাতে রাখেন। আর আল্লাহর প্রতিদান কত মহৎ! আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَ جَزٰٓؤُا سَیِّئَۃٍ سَیِّئَۃٌ مِّثۡلُهَا ۚ فَمَنۡ عَفَا وَ اَصۡلَحَ فَاَجۡرُهٗ عَلَی اللّٰهِ ؕ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الظّٰلِمِیۡنَ

‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ দ্বারা এবং যে ক্ষমা করে ও আপোষ-নিস্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। আল্লাহ যালিমদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আশ-শুরা: আয়াত ৪০)

২. আল্লাহ ক্ষমাশীলদের ভালোবাসেন

রাগ গিলে ফেলে অন্যকে ক্ষমা করা মহান আল্লাহর ভালোবাসার পথ। আল্লাহ তাআলা বলেন—

الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ فِی السَّرَّآءِ وَ الضَّرَّآءِ وَ الۡكٰظِمِیۡنَ الۡغَیۡظَ وَ الۡعَافِیۡنَ عَنِ النَّاسِ ؕ وَ اللّٰهُ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ

‘যারা স্বচ্ছলতা ও অভাবের মধ্যে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানবদেরকে ক্ষমা করে; এবং আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)

হাদিসে ক্ষমার মহত্ব

১. ক্ষমা মানুষকে সম্মানিত করে

ক্ষমা মানুষের চোখে নয়, বরং আল্লাহর কাছে মর্যাদা বেড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

وما زادَ اللهُ عبدًا بعفوٍ إلا عزًّا

‘বান্দা ক্ষমা করলেই আল্লাহ তার মান–সম্মান বৃদ্ধি করেন।’ (মুসলিম ৬৭৫৭)

২. নবীজির চরিত্র—সকল অন্যায়ের উত্তরে ক্ষমা

নবীজিকে (সা.) মানুষ কষ্ট দিলেও তিনি তাদের জন্য দোয়া করতেন, প্রতিশোধ নিতেন না। এটাই ক্ষমার সর্বোচ্চ উদাহরণ—এক কথায় মহানুভবতার জ্যোতি। মক্কা বিজয়ের দিনে যারা তাকে বছরের পর বছর নির্যাতন করেছিল, তিনি বললেন—

اذهبوا فأنتم الطلقاء

‘তোমরা যাও, তোমরা সবাই মুক্ত।’ (ইবন হিশাম)

ক্ষমা নিয়ে রয়েছে মনীষীদের বাণী—

১. হজরত ইমাম শাফি (রহ.) বলেছেন—

‘যে ক্ষমা করে দিল সে ঘৃণা থেকে মুক্ত হলো; আর ঘৃণা হলো হৃদয়ের রোগ।’

২. হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেছেন—

‘শত্রুর উপর সর্বোত্তম বিজয় হলো তাকে ক্ষমা করে দেওয়া।’

৩. হজরত হাসান আল-বাসরি (রহ.)

‘ক্ষমা এমন একটি গুণ, যা শুধু শক্তিশালী মানুষের পক্ষেই সম্ভব।’

৪. হজরত ওমর ইবন আল-খাত্তাব (রা.) বলেছেন—

‘মানুষের উপর প্রতিশোধ সহজ; কিন্তু ক্ষমা করা শুধু মহত্ত্বের কাজ।’

ক্ষমা যেসব কারণে সবচেয়ে মধুর প্রতিশোধ—

ক্ষমা মানুষকে আঘাত দেয় না—হৃদয়কে জিতে নেয়

ক্ষমা রাগকে গলিয়ে শান্তি এনে দেয়

ক্ষমা সম্পর্কের ভাঙনকে জোড়া লাগায়

ক্ষমা আল্লাহর রহমত ডেকে আনে

ক্ষমাকারী সবসময় সম্মানিত হয়

ক্ষমা মানুষের আত্মাকে পবিত্র করে

ক্ষমা করলে মানুষ বড় হয়—আঘাত নয়, ভালোবাসা জন্ম নেয়। আর সত্যিই— প্রতিশোধ কখনো জয় নয়; ক্ষমাই প্রকৃত বিজয়।

পরিশেষে ক্ষমা হলো হৃদয়ের সেই আলো, যা মানুষের রাগ, কষ্ট এবং ঘৃণার অন্ধকার দূর করে দেয়। প্রতিশোধ ক্ষত গভীর করে, কিন্তু ক্ষমা ক্ষত সারিয়ে দেয়। আমরা যখন ক্ষমা করি, তখন অপরাধী নয়— আমরাই প্রথম মুক্ত হই। ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের হৃদয়কে প্রসারিত করেন, সম্মান বাড়িয়ে দেন, শান্তি নাজিল করেন এবং জান্নাতের পথ সুগম করেন। তাই সম্পর্কের ভাঙন, জীবনের কষ্ট, মানুষের আচরণ—সবকিছুর উত্তম প্রতিক্রিয়া হলো ক্ষমা।

HN
আরও পড়ুন