বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসার শুরু খুব বেশি দিনের না হলেও খুব অল্পসময়েই এর বিস্তার লাভ করেছে। দৈনন্দিন জীবন সহজ করছে অনলাইন কেনাকাটা। ফলে প্রতিনিয়তই অনলাইনে বাড়ছে কেনাকাটা। পাশাপাশি শুরু থেকেই অভিযোগও কম নয়। অর্থ পরিশোধ করে পণ্য বুঝে না পাওয়া, এক পণ্য অর্ডার করে অন্য পণ্য বুঝে পাওয়া। এতোকিছু চাপিয়ে সর্বশেষ সংযোজন পণ্যের গুনগত মান ঠিক না হওয়া।
সম্প্রতি এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব আলোচিত একটি ঘটনা পাকিস্তানি পণ্য বলে গুলিস্তানের পণ্য বিক্রি। এক বছর আগে অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন আলোচিত যুগল তনি। ব্যবসা শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই রাজধানী ঢাকায় কয়েকটি শোরুম চালু করেন। অনলাইনে কেনাকাটা করেন এমন কেউ নেই তাকে চিনে না। তবে এতো অল্প সময়ে এতোগুলো শোরুম চালু করার পেছনে রহস্য কী এ নিয়ে অনেকের প্রশ্ন জাগে। এর মধ্যেই তনির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তিনি গুলিস্তান থেকে কাপড় কিনে সেগুলো পাকিস্তানের বলে অনলাইনসহ তার শোরুমে বিক্রি করতেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে এমনই প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। শুধু তাই নয়, গুলশান এক নম্বরের পুলিশ প্লাজার সানভি’স বাই তনি শোরুমটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এমন হাজারো অভিযোগ রয়েছে প্রতারিত হওয়ার। অনলাইনে শপিং করেন অথচ জীবনে একবার হলেও প্রতারিত হননি এমন ক্রেতা পাওয়া খুব কঠিন। প্রতিনিয়ত কেউ না কেউ, হয় পণ্য বুঝে পাননি না হয় অর্ডার করেছেন একটি পেয়েছেন অন্যটি। অথবা পণের মান যা বলা হয়েছে তার ধারে কাছেও নেই। কিন্তু আলোচনায় নেই। কিংবা অভিযোগও নেই। কেউ কেউ অভিযোগ করতে চাইলেও কিভাবে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে তাও জানেন না। আবার অভিযোগ করে কেউ কেউ বিচার না পাওয়ার আক্ষেপও আছে। ফলে প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা।
অনলাইনে পণ্য ক্রয় করে প্রতারণার বিষয়ে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, আমরা বেশ কয়েকজন ভোক্তার কাছে অভিযোগ পেয়েছি, তারা পাকিস্তানি ড্রেস (পোশাক) অনলাইনে বিক্রি করে কিন্তু তারা ডেলিভারি দেওয়ার সময় দেশি ড্রেস দেয়। সেগুলো পাকিস্তানি নামে বিক্রি করে আসছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নোটিশ জারি করা হয় শুনানির জন্য, তিনি আসেননি। তাই আমরা অভিযানে এসেছি, অভিযানে তারা কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। আমরা শোরুম বন্ধ করে দিয়েছি। এরপর পোশাক আমদানির কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলেছি। এমন অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। ভোক্তা অধিদপ্তর থেকে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে বলেও জানান তিনি।
অনলাই ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যারা অনলাইনে কেনাকাটা করে অভ্যস্ত তাদের কয়েকেটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কাঙ্ক্ষিত ওয়েবসাইটে ঢোকার আগে সেটির বানান ও ডিজাইনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতারক চক্র অনেক সময়ই বিখ্যাত, প্রতিষ্ঠিত কোনো অনলাইনের ওয়েবসাইটের হুবহু প্রতিরূপ তৈরি করে। কখনো বানানে সামান্য পরিবর্তন এনে, কখনো ডিজাইনে। এ ছাড়া ওয়েব অ্যাড্রেস 'http' এর সঙ্গে 's' না থাকলে অর্থাৎ 'https' না থাকলে সেই ওয়েবসাইটটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা আছে।
আরো একটি বিষয় হচ্ছে- ওয়েবসাইটটির একটি পূর্ণ ডোমেইন নেইম থাকবে, অর্থাৎ (WWW.) এর পরে কোনো একটি নাম এবং শেষে (.COM) থাকবে। ওয়েবসাইটটি কোনো রেনডম নম্বর দিয়ে শুরু হবে না।
তবে দেশে নতুন হওয়ায় ই-কমার্স সাইট কিংবা অনলাইন শপের সঠিক সংখ্যা কারো জানা নেই। কয়েকটি তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে প্রায় হাজার খানেক ই-কমার্স সাইট রয়েছে। আর অনলাইন শপের সংখ্যা শ খানেক।
বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র একটি অংশ অনলাইন মার্কেটিং বা ই-কমার্সের সঙ্গে জড়িত।
এ বিষয়ে কথা হয় ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি শমী কায়সারের সাথে। তিনি দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, আমরা মনে করি, ভূঁইফোড় কিংবা ডিজঅনেস্টিতে ব্যবসা করে খুব অল্প সংখ্যক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। বেশিরভাগ উদ্যোক্তা সততা নিয়ে ডিজিটাল ব্যবসায় এসেছে, এর মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা রয়েছেন। যারা অন্যায় করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। এ খাতে গ্রাহকের আস্থা ও ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজ করছি।
অনলাইন ব্যবসা নিয়ে কথা হয় নিউমার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী জহির রায়হানের সঙ্গে। তিনি দৈনিক খবর সংযোগকে বলেন, অনলাইন ব্যবসা সম্পূর্ণ প্রতারণা। আমরা যে দামে পণ্য ক্রয় করে আনি তার থেকে কম দামে অনলাইনে বিক্রি করছে। আগে এ নিয়ে কৌতুহল ছিল জানার। কিন্তু কিছুদিন আগে আমার এক পরিচিত ব্যবসায়ীর মাধ্যমে আমার কাছে অনলাইন বিজনেস করেন এমন একজন আসেন। মূলত তার কাছেই এ ব্যবসার সম্পর্কে ধারণা পাই। প্রতিটি দোকানেই পণ্য বিক্রি করতে করতে কিছু মাল থেকে যায়। যাকে দোকানির ভাষায় ভাঙা মাল বলে। দুই তিনি বছরের বেশি যে পণগুলো থেকে যায় সেগুলো লটে কম দামে বিক্রি করে দেয় দোকানিরা। মূলত সেই পণ্য কিনেই অনলাইনে অধিকাংশ ব্যবসায়ী ব্যবসা করছে। তাই এসব পণ্য কিছুদিন যেতেই রং ফেকাসে হয়ে যায়। এবং এসব পণ্যে বেশিদিন ব্যবহার করা যায় না বলেও জানান তিনি।
