ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের আহ্বান আইরিশ কৌতুক অভিনেতার

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম

গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে ইসরায়েলের বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচ বয়কট করতে আয়ারল্যান্ডের ফুটবলারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আইরিশ কৌতুক অভিনেতা ও অধিকারকর্মী তাধগ হিকি। তার অভিযোগ, এই ম্যাচ ঘিরে ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা সত্ত্বেও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সিদ্ধান্তের ভার খেলোয়াড়দের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিকি বলেন, আয়ারল্যান্ডের অধিকাংশ মানুষ ম্যাচটি বয়কটের পক্ষে থাকলেও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এ বিষয়ে নেতৃত্বের ভূমিকা নেয়নি। তিনি বলেন, ক্রীড়া বয়কটের ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ড প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিষয়টি খেলোয়াড়দের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

হিকির ভাষ্য অনুযায়ী, সংবাদ সম্মেলনে সর্বশেষ যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে খেলোয়াড়দের মধ্যে একটি মতামত জরিপ করা হয়েছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ খেলোয়াড় ম্যাচটি খেলতে চেয়েছেন। তবে ওই জরিপ কোন পরিস্থিতিতে বা কীভাবে করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আয়ারল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে জানায়, ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও ২০২৬-২৭ উয়েফা নেশনস লিগে ইসরায়েলের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে। খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনা করার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ খেলোয়াড় ম্যাচগুলো খেলার পক্ষে মত দিয়েছেন বলে বিবৃতিতে জানানো হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব খেলোয়াড়ের মতামতকে সম্মান করার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।

আইরিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোলরক্ষক গ্যাভিন বাজুনুসহ কয়েকজন খেলোয়াড় ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

এদিকে ম্যাচটি ‘স্টপ দ্য গেম’ প্রচারণারও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন আইরিশ স্পোর্ট ফর প্যালেস্টাইনের উদ্যোগে পরিচালিত এই প্রচারণা গাজায় ইসরায়েলের চলমান হামলার প্রতিবাদে আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়দের ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

প্রচারণাটির মুখপাত্র শেন মুর বলেন, ম্যাচটি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে এবং ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও খেলোয়াড়দের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে। তার দাবি, ম্যাচ আয়োজনের বিরোধিতায় দীর্ঘদিন ধরে জনমত তৈরি হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে সেই চাপ আরও বেড়েছে।

সমর্থকদের জন্য টিকিট নিয়েও অভিযোগ

ম্যাচ আয়োজনের ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনা করেছে ‘স্টপ দ্য গেম’ প্রচারণা। মুর অভিযোগ করেন, আইরিশ সমর্থকদের জন্য কোনো টিকিট বরাদ্দ করা হয়নি, অথচ ইসরায়েলি সমর্থকদের ম্যাচে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, ম্যাচটি আইরিশ সমর্থকদের জন্য কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে ইসরায়েলি সমর্থকদের টিকিট দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে ম্যাচে আইরিশ সমর্থকদের উপস্থিতি থাকবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

মুর হাঙ্গেরি ও সার্বিয়ায় ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি, দুটি দেশের সঙ্গেই ইসরায়েলের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। তিনি দেশ দুটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসরায়েলি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং ইসরায়েল থেকে ওই শহরগুলোর সঙ্গে বিমান যোগাযোগের বিষয়টি উল্লেখ করেন।

তবে সাক্ষাৎকারে ভেন্যু ও যাতায়াত ব্যবস্থার বিষয়ে মুরের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

গোলরক্ষক গ্যাভিন বাজুনু দল থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে যে তথ্য এসেছে, সেটিকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন হিকি। তিনি বলেন, বাজুনু কার্যত বিবেকের তাড়নায় দল থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এবং খেলবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আরও খেলোয়াড় তার অনুসরণ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

‘আয়ারল্যান্ড এখন অবস্থান না নিলে আর নেওয়া হবে না’

মুরও বাজুনুর সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। তিনি তাকে ‘নায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, আরও অন্তত ছয়জন খেলোয়াড় ম্যাচটি না খেলার পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

হিকি বলেন, আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি দেশটির সমর্থনের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ম্যাচটি ঘিরে বর্তমান বিতর্কটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্য, আয়ারল্যান্ডের ঐতিহ্যের সঙ্গে সংহতি, ঐক্য এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বিষয়টি জড়িয়ে আছে।

ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘বুলি’ হিসেবে অভিহিত করে হিকি বলেন, বিভিন্ন দেশে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মধ্যেও ইসরায়েলের পক্ষে থাকা শক্তি রয়েছে।

আইরিশ কোচের সংবাদ সম্মেলনের প্রসঙ্গ তুলে হিকি বলেন, সেখানে কিছু সাংবাদিক কোচকে নাৎসি জার্মানির প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছেন এবং হামাসের নিন্দা করেন কি না, তা জানতে চেয়েছেন। তার মতে, পরিস্থিতিটি অত্যন্ত গুরুতর হলেও এর মধ্যে একটি অস্বাভাবিক বৈপরীত্য রয়েছে।

হিকি আরও বলেন, আয়ারল্যান্ডের কোচকে ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহারের ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, আয়ারল্যান্ড এখন অবস্থান না নিলে ভবিষ্যতে আর সেই অবস্থান নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

ম্যাচটি ঘিরে আন্তর্জাতিক মনোযোগ খেলোয়াড়দের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন হিকি। তার মতে, ম্যাচটি খেললে নৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের মানসিক চাপের মধ্যেও পড়তে হতে পারে, কারণ এখন পুরো বিশ্বের নজর তাদের ওপর রয়েছে।

ম্যাচের আগে সমর্থকদের ‘স্টপ দ্য গেম’ প্রচারণার পাশে থাকার আহ্বান জানান হিকি।

মুর বলেন, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও খেলোয়াড়দের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে তাদের প্রচারণা। তিনি খেলোয়াড়দের অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা তা করলে তাদের নায়ক হিসেবে দেখা হবে।

মুর আরও বলেন, ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হলে পরের সপ্তাহে ঘরের মাঠে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আয়ারল্যান্ডের ম্যাচ রয়েছে। সেক্ষেত্রে কী পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

‘গণহত্যার বিরুদ্ধে খেলছি’

ইসরায়েলের বিপক্ষে আসন্ন উয়েফা নেশনস লিগের ম্যাচটি খেলা উচিত নয়, আয়ারল্যান্ড জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রকাশ্যে প্রথম এমন মত দেন মিডফিল্ডার জেসন নাইট। তিনি বলেন, তার মতে ম্যাচটি হওয়া উচিত নয়, যদিও শেষ পর্যন্ত তা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

২৫ বছর বয়সী ব্রিস্টল সিটির এই মিডফিল্ডার জানান, হাঙ্গেরিতে রোববারের ম্যাচটি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে দল আরও বিস্তারিত আলোচনা করবে।

এদিকে ১৬০ জনের বেশি আইরিশ ক্রীড়াবিদ জাতীয় দলকে ইসরায়েলের বিপক্ষে না খেলার আহ্বান জানিয়ে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। পাশাপাশি ‘স্টপ দ্য গেম’ প্রচারণার পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ স্থগিত করার দাবিতে বিক্ষোভও আয়োজন করা হয়েছে।

আয়ারল্যান্ডের প্রধান কোচ হেইমির হালগ্রিমসন এর আগে জানিয়েছিলেন, কিছু খেলোয়াড় ম্যাচগুলো নিয়ে ‘খুবই অস্বস্তিতে’ রয়েছেন। তিনি দলটির বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যার বিরুদ্ধে খেলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার ওই মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।

ইসরায়েলের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি রোববার হাঙ্গেরির দেব্রেসেনের নাগিয়েরদেই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরের মাঠের ম্যাচটি ডাবলিন থেকে সরিয়ে সার্বিয়ার বাক্কা তোপোলায় নেওয়া হয়েছে। ওই ম্যাচটি ৪ অক্টোবর দর্শকশূন্য মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

এএস
আরও পড়ুন