ফুটবল মাঠে তারকাদের পছন্দের খাবার ও পানীয় নিয়ে ভক্তদের আগ্রহের শেষ নেই। লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ, আন্তোয়ান গ্রিজমান কিংবা আর্লিং হলান্ড বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত মুখদের সঙ্গে বারবার আলোচনায় এসেছে এক বিশেষ পানীয়। নাম তার ‘মাতে’। দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী এই পানীয় আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবে শুধু ঐতিহ্য নয়, এর স্বাদ, উপাদান ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও পানীয়টিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।
তারকাদের পছন্দের পানীয় মাতে
লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজের মতো ফুটবলারদের হাতে প্রায়ই দেখা যায় মাতে পান করার বিশেষ পাত্র। আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের মধ্যে পানীয়টি এতটাই জনপ্রিয় যে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের আড্ডা ও অনুশীলনের বাইরেও এটি তাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
ফরাসি ফুটবলার আন্তোয়ান গ্রিজমানও মাতে পান করার জন্য পরিচিত। ইউরোপীয় ফুটবলে খেলা অনেক দক্ষিণ আমেরিকান খেলোয়াড়ের মাধ্যমে পানীয়টি অন্য ফুটবলারদের মধ্যেও পরিচিতি পেয়েছে।

নরওয়ের তারকা আর্লিং হলান্ডও মাতে নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজ ও জেরোনিমো রুলির সঙ্গে মাতে পান করার ছবি প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার সীমানা পেরিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলারদের মধ্যেও পানীয়টি নিয়ে আগ্রহের বিষয়টি সামনে এসেছে।
কী দিয়ে তৈরি হয় মাতে?
মাতে তৈরি করা হয় ‘ইয়েরবা মাতে’ নামের একটি উদ্ভিদের শুকনো পাতা দিয়ে। গরম পানিতে এই পাতা ভিজিয়ে তৈরি করা হয় পানীয়টি। সাধারণত বিশেষ ধরনের ছোট পাত্রে মাতে পরিবেশন করা হয়। পাত্রটিকে বলা হয় ‘কালাবাশ’। আর পান করার জন্য ব্যবহার করা হয় ছাঁকনিযুক্ত ধাতব নল, যার নাম ‘বোমবিয়া’।
মাতে তৈরির পদ্ধতি বেশ সহজ হলেও পান করার রয়েছে নিজস্ব রীতি। পাত্রে শুকনো ইয়েরবা মাতে পাতা দিয়ে তাতে গরম পানি ঢালা হয়। এরপর বোমবিয়ার সাহায্যে পান করা হয়। অনেকেই একই পাত্রে বারবার গরম পানি ঢেলে পানীয়টি উপভোগ করেন।

দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী গুয়ারানি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের সঙ্গে মাতে গভীরভাবে যুক্ত। সময়ের সঙ্গে এটি আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
কী আছে এই পানীয়তে?
মাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ক্যাফেইন। এ কারণে এটি পান করলে সতেজ অনুভূতি হতে পারে এবং সাময়িকভাবে মনোযোগ ও সজাগভাব বাড়তে পারে। কফি ও চায়ের মতো মাতে থেকেও শরীরে ক্যাফেইন প্রবেশ করে। তবে এতে ক্যাফেইনের পরিমাণ পাতা, প্রস্তুতপ্রণালি ও পান করার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।
এ ছাড়া ইয়েরবা মাতে পাতায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ যৌগ, যার মধ্যে পলিফেনল ও অন্যান্য অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উল্লেখযোগ্য। এসব যৌগ শরীরে অক্সিডেটিভ চাপ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে। পাতায় কিছু ভিটামিন ও খনিজও পাওয়া যায়। তবে পানীয়টি কতটা পুষ্টি সরবরাহ করবে, তা নির্ভর করে ব্যবহৃত পাতার পরিমাণ ও পান করার পদ্ধতির ওপর।
মাতের উপাদান নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় বিপাকক্রিয়া, রক্তে শর্করা ও চর্বির মাত্রাসহ কয়েকটি স্বাস্থ্যগত বিষয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে প্রমাণ এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়। তাই মাতে পান করলেই শারীরিক সক্ষমতা বাড়বে কিংবা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিশ্চিতভাবে উন্নত হবে এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
ফুটবলারদের কাছে কেন জনপ্রিয়?
ফুটবলারদের কাছে মাতের জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু এর উপাদান নয়, সাংস্কৃতিক অভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখে। আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের অনেক খেলোয়াড় ছোটবেলা থেকেই মাতে পান করতে অভ্যস্ত। জাতীয় দল কিংবা ক্লাবের সতীর্থদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়ও পানীয়টি ভাগাভাগি করে পান করার চল রয়েছে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের জন্য বিপুল পরিমাণ মাতে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দলটির সঙ্গে প্রায় ২৪০ কেজি মাতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। লিওনেল মেসি ও রদ্রিগো দি পলের মতো খেলোয়াড়দের দৈনন্দিন রুটিনেও পানীয়টির জায়গা থাকার কথা উঠে এসেছে।
এখানে মাতে কেবল পানীয় নয়, বরং সতীর্থদের মধ্যে বন্ধন তৈরি ও একসঙ্গে সময় কাটানোর একটি মাধ্যম। একজনের পাত্র থেকে আরেকজনের পান করা দক্ষিণ আমেরিকার সামাজিক সংস্কৃতিরও পরিচিত অংশ।
মাতে কি ক্রীড়াবিদদের জন্য উপকারী?
মাতেতে থাকা ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সজাগভাব বাড়াতে পারে। কিছু গবেষণায় ক্যাফেইনের সঙ্গে ব্যায়ামের সময় মনোযোগ ও কর্মক্ষমতার সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে মাতে পান করার কারণে মেসি, সুয়ারেজ কিংবা হলান্ডের মতো ফুটবলাররা বিশেষ পারফরম্যান্স দেখান এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

একজন পেশাদার ফুটবলারের পারফরম্যান্স নির্ভর করে নিয়মিত অনুশীলন, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, পানিশূন্যতা এড়ানো, পুনরুদ্ধার এবং ব্যক্তিগত শারীরিক সক্ষমতার ওপর। মাতে এসবের বিকল্প নয়।
পানীয়টিতে ক্যাফেইন থাকায় অতিরিক্ত পান করলে ঘুমের ব্যাঘাত, অস্থিরতা বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের কাছাকাছি সময়ে এটি পান করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো। খুব গরম পানীয় নিয়মিত পান করাও এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ অতিরিক্ত গরম পানীয় খাদ্যনালির ক্ষতির ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঐতিহ্য থেকে বিশ্ব ফুটবলে
একসময় দক্ষিণ আমেরিকার ঘরোয়া সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পরিচিত মাতে এখন বিশ্ব ফুটবলের আলোচনাতেও জায়গা করে নিয়েছে। মেসি-সুয়ারেজের মতো তারকাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস কিংবা হলান্ডের মতো ইউরোপীয় ফুটবলারের আগ্রহ সব মিলিয়ে পানীয়টি পেয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি।

তবে মাতের আসল আকর্ষণ শুধু এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, সামাজিকতা ও সংস্কৃতি। ফুটবলারদের কাছে এটি যেমন সতেজ হওয়ার একটি উপায়, তেমনি সতীর্থদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার উপলক্ষও।
সব মিলিয়ে, মাতে কোনো জাদুকরি পানীয় নয়। বরং ঐতিহ্য, স্বাদ ও ক্যাফেইনের সমন্বয়ে তৈরি এমন একটি পানীয়, যা দক্ষিণ আমেরিকার মানুষের জীবনযাত্রা থেকে বিশ্ব ফুটবলের তারকাদের অভ্যাসে জায়গা করে নিয়েছে।