দেশীয় কটন সুতা শিল্প সুরক্ষায় বন্ড সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সুরক্ষায় কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল বা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এমন অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছে। 

রোববার (১৮ জানুয়ারি) এনবিআরের কাস্টমস নীতি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো চিঠির সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ৬ জানুয়ারি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানি বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুতা উৎপাদন খাতকে রক্ষার জন্য ওই সুপারিশ সমর্থন করেছে। ভবিষ্যতে রপ্তানি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং স্থানীয় শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংরক্ষণের স্বার্থে বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফের ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া আমদানি বিল অব এন্ট্রিতে বাণিজ্যিক বর্ণনায় কটন সুতার কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কাস্টম হাউসসমূহকে নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধও করা হয়েছে। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা যায়, বাংলাদেশে রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশ টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত থেকে আসে, যার মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ রপ্তানি আয় হয় নিট গার্মেন্টস খাত থেকে। রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার আশির দশক থেকে এ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে। নিট গার্মেন্টসের কাঁচামাল হিসেবে সুতা বন্ড সুবিধায় আমদানি হয়ে থাকে। তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তারা এ খাতে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে সুতা ও কাপড় উৎপাদনের অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন। এর ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থানীয় কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কটন সুতা ও ব্লেন্ডেড ইয়ার্ন সরবরাহে দেশের সামগ্রিক চাহিদা পূরণে সক্ষম।

সূত্র বলছে, দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ নিট গার্মেন্টসে কাঁচামাল হিসেবে সুতার বড় একটি অংশ জোগান দিতে সক্ষম। পার্শ্ববর্তী দেশে ৩০ কাউন্টের ১ কেজি সুতার ন্যূনতম মূল্য ২.৯৩ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের উৎপাদিত সুতার উৎপাদন খরচের প্রায় কাছাকাছি। দেশের স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি সুতা বিক্রয় মূল্য ২.৮৫ মার্কিন ডলার বলে জানা গেছে। এদিকে সাম্প্রতিককালে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এ খাতে সহায়ক শিল্পনীতি যেমন কম দামে জমি প্রদান, বিক্রয়ের ওপর আয়কর অব্যাহতি, স্কিল ডেভেলপমেন্টে বিশেষ আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন গ্রহণ করায় তারা প্রায় ৩০ সেন্টের সমপরিমাণ সহায়তা পাচ্ছে। ফলে প্রতি কেজি সুতার উৎপাদন খরচের চেয়ে ৩০–৩৮ সেন্ট কম দামে গড়ে ২.৫০–২.৬০ মার্কিন ডলার মূল্যে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করছে। অপরদিকে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করে সুতার উৎপাদন মূল্য কমিয়েও প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রণোদনাপ্রাপ্ত মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে এ খাতে দেশীয় উদ্যোক্তারা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং তাদের বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়ছে।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত দুই অর্থবছরে বন্ড সুবিধায় সুতার আমদানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার বিক্রয় হ্রাস পেয়েছে এবং বর্তমানে সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে তাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে। এর ফলে স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারী শিল্প ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশীয় বৃহৎ প্রায় ৫০টি সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। সুতা আমদানির এ ধারা অব্যাহত থাকলে অন্যান্য সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে উদ্যোক্তারা মত প্রকাশ করেছেন। নিকট ভবিষ্যতে নিট গার্মেন্টস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানিকৃত সুতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে, যা দেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস, লিড টাইম বৃদ্ধি, মূল্য সংযোজন কমে যাওয়া এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করবে। এ কারণে জরুরি ভিত্তিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানি বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে মন্ত্রণালয়।

AHA
আরও পড়ুন