ফিনল্যান্ডভিত্তিক আমদানিকারকের উদ্বেগ

ইউরোপে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের চালান ধ্বংস, বাড়ছে ক্ষতিপূরণের বিরোধ!

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ এএম

বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করলেও সাম্প্রতিক একটি বাণিজ্যিক বিরোধ দেশের রপ্তানি খাতের ভাবমূর্তি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং বিদেশে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ফিনল্যান্ডভিত্তিক আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান OY Bengal Trading Ltd AB-এর দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা ‘Fresh’ ব্র্যান্ডের ৪,৫২০ কেজি মুড়ির (Puffed Rice) একটি চালান ইউরোপে প্রবেশের সময় বেলজিয়ামের একটি বন্দরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের মুখোমুখি হয়। 

আমদানিকারকের ভাষ্যমতে, পরিদর্শন শেষে কর্তৃপক্ষ পণ্যটিকে মানব ভোগের জন্য অনুপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করে এবং প্রযোজ্য ইউরোপীয় বিধি অনুযায়ী দুটি বিকল্প প্রদান করে, পণ্যটি বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো অথবা ইউরোপেই ধ্বংস করা।

OY Bengal Trading Ltd AB-এর দাবি, পরবর্তীতে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান Meghna Group of Industries (MGI)-এর প্রতিনিধিরা পণ্যটি বাংলাদেশে ফেরত না পাঠিয়ে বেলজিয়ামেই ধ্বংস করার অনুরোধ জানান। 

আমদানিকারকের বক্তব্য অনুযায়ী, পণ্য ফেরত পাঠানো হলে সম্ভাব্য সুনামগত ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে, এমন উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে স্থানীয়ভাবে ধ্বংসের সিদ্ধান্তকে উৎসাহিত করা হয়। এর ফলে সৃষ্ট সকল ব্যয়, ক্ষতি ও আর্থিক দায়ভার পূর্ণাঙ্গভাবে পরিশোধের আশ্বাস প্রদান করা হয়।

আমদানিকারকের দাবি অনুযায়ী, উক্ত আশ্বাসের ভিত্তিতে এবং বেলজিয়ামের কাস্টমস ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করে OY Bengal Trading Ltd AB পণ্য ধ্বংসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। 

এর ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসকরণ ব্যয়, গুদামজাতকরণ খরচ, প্রশাসনিক ফি, বন্দর চার্জ, পরিবহন ব্যয় এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। একটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ব্যয় তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।

তবে আমদানিকারকের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার পর কয়েক মাস অতিবাহিত হলেও পণ্যের মূল্য, পরিবহন ব্যয়, ধ্বংসকরণ খরচ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আর্থিক ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ এখনো পরিশোধ করা হয়নি। 

ফলে প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্যকরী মূলধন দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে, যা তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

OY Bengal Trading Ltd AB-এর মতে, বিষয়টি কেবল একটি আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের মধ্যকার বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো খাদ্যপণ্য নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রত্যাখ্যাত হলে এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ক্ষতিপূরণ বা বাণিজ্যিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো দ্রুত ও ন্যায্যভাবে নিষ্পত্তি না হলে বিদেশি ক্রেতা ও আমদানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

বাণিজ্য ও রপ্তানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সফলতা ধরে রাখতে হলে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রপ্তানির পূর্বে কার্যকর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ এবং সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি খাতের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতি প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশিত। বিদেশি আমদানিকারকদের আস্থা ধরে রাখা বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের অন্যতম পূর্বশর্ত।

এই প্রেক্ষাপটে OY Bengal Trading Ltd AB সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে। 

প্রতিষ্ঠানটির মতে, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায্য সমাধান নিশ্চিত করা হলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকই উপকৃত হবেন না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি খাদ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের প্রতি আস্থাও আরও সুদৃঢ় হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের খাদ্য রপ্তানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উৎপাদন, কঠোর গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর রপ্তানি তদারকি, দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ এবং বাণিজ্যিক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বিদেশি আমদানিকারকদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের খাদ্য রপ্তানি শিল্প বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। সেই সম্ভাবনাকে টেকসই ও শক্তিশালী করতে হলে পণ্যের মান, ব্যবসায়িক নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা এবং বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

HN
আরও পড়ুন