জিআই স্বীকৃতির পর সম্ভাবনা বাড়ছে বরিশালের আমড়ার

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝালকাঠির নদী-খালঘেরা জনপদে শুরু হয়েছে আমড়ার ব্যস্ত মৌসুম। ভোর হতেই বাগান থেকে আমড়া সংগ্রহ করে নৌকায় তোলা হচ্ছে। এরপর সেই নৌকা ছুটছে ভীমরুলীর ভাসমান হাটে। পানির ওপর সারি সারি নৌকায় সাজানো সবুজ-হলুদ আমড়া, ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। এখান থেকে আমড়া যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

দেশজুড়ে ‘বরিশালের আমড়া’ নামে পরিচিত এ ফলের বড় একটি অংশের জোগান আসে ঝালকাঠি থেকে। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬০৫ হেক্টর জমিতে আমড়ার আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এসব আমড়ার মূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা। আমড়াকে ঘিরে শুধু কৃষকের আয়ই বাড়ছে না, কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে শ্রমিক, আড়তদার, পাইকার ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষেরও।

পেয়ারার রাজ্যে আমড়ার উত্থান

একসময় ঝালকাঠি, পিরোজপুরের নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পরিচিত ছিল পেয়ারাবাগানের জন্য। নদী-খালের ওপর গড়ে ওঠা কান্দির বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে নৌপথে দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠানো হতো। এখন সেই বাগানেই জায়গা করে নিচ্ছে আমড়ার গাছ।

কৃষকদের ভাষ্য, পেয়ারার উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। পাশাপাশি অনাবৃষ্টি ও রোগবালাইয়ের কারণে অনেক এলাকায় ফলনও কমেছে। দ্রুত পেকে যাওয়ায় পেয়ারা সময়মতো বাজারজাত করতে না পারলে লোকসানের ঝুঁকি থাকে। তুলনায় আমড়ার পরিচর্যা সহজ, উৎপাদন খরচ কম এবং ফল কিছুটা বেশি সময় সংরক্ষণ করা যায়। এসব কারণেই কৃষকেরা বিকল্প হিসেবে আমড়ার দিকে ঝুঁকছেন।

ভীমরুলীর চাষি পুষ্প রানী সমাদ্দার বলেন, তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে পেয়ারা চাষের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এখন পেয়ারায় আগের মতো লাভ হচ্ছে না। তাই পুরোনো বাগানের পাশাপাশি আমড়ার চাষ বাড়াচ্ছেন তাঁরা। এ বছর ফলন কিছুটা কম হলেও আমড়ার ভালো দামে খরচ উঠে এসেছে।

ভীমরুলীর পানিতে ভাসে আমড়ার বাজার

ঝালকাঠির আমড়ার সবচেয়ে পরিচিত পাইকারি কেন্দ্র ভীমরুলীর ভাসমান হাট। মৌসুমে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত নৌকায় নৌকায় চলে ফলের বেচাকেনা। চাষিরা বাগান থেকে আমড়া এনে নৌকায় সাজিয়ে রাখেন। পাইকাররা নৌকায় নৌকায় ঘুরে ফলের মান যাচাই করে দরদাম করেন।

বর্তমানে আকার, রং ও মানভেদে প্রতি মণ আমড়া ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের আমড়ার দাম তুলনামূলক বেশি। মৌসুমের শেষ দিকে বাজার আরও চড়া হতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন।

ঝালকাঠির পাইকারি ব্যবসায়ী তাপস ব্যাপারী জানান, ঝালকাঠি, নেছারাবাদ ও বানারীপাড়া এলাকায় কয়েক ডজন পাইকার আমড়া সংগ্রহ করেন। তাঁদের অনেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ মণ পর্যন্ত আমড়া ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে পাঠান।

একেকটি বাগানেই লাখ টাকার হিসাব

আমড়ার ভালো বাজারদর কৃষকদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। ভীমরুলী গ্রামের চাষি হরিবর রায়ের দুটি বাগানে প্রায় ৫০০টি আমড়াগাছ রয়েছে। চলতি মৌসুমে গাছগুলোতে ভালো ফলন হয়েছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে প্রায় ৩ হাজার টাকার আমড়া বিক্রি হতে পারে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকার আমড়া বিক্রির আশা করছেন তিনি।

হরিবর রায় বলেন, আমড়ার জন্য খুব বেশি সার-কীটনাশক কিংবা শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় বিক্রির পর লাভের পরিমাণও ভালো থাকে। এ কারণেই এলাকায় আমড়ার বাগান বাড়ছে।

কীর্তিপাশা ইউনিয়নের কৃষক ভবেন্দ্রনাথ হালদারও মনে করেন, পেয়ারার তুলনায় আমড়া এখন বেশি লাভজনক। তাঁর ভাষ্য, একটি আমড়াগাছে তিন থেকে চার মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। কয়েকজন শ্রমিক একসঙ্গে একাধিক গাছের ফল সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতিদিন ফল পাড়ারও প্রয়োজন হয় না। ফলে উৎপাদন ও শ্রম—দুই ক্ষেত্রেই ব্যয় তুলনামূলক কম।

আমড়ার মৌসুমে বাড়ছে কর্মসংস্থান

আমড়ার বাগান থেকে ভাসমান হাট, আড়ত থেকে পরিবহন প্রতিটি ধাপেই যুক্ত হচ্ছেন শ্রমজীবী মানুষ। কেউ গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করছেন, কেউ বাছাই করছেন, কেউ বস্তায় ভরছেন। আবার কেউ নৌকা কিংবা ট্রাকে আমড়া তোলার কাজ করছেন।

শতদশকাঠির একটি আমড়া আড়তে কাজ করা শ্রমিক রবিউল ইসলাম জানান, মৌসুমকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কাজের সুযোগ হয়েছে। কাজের ধরন অনুযায়ী দৈনিক ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন অনেকে। আমড়ার মৌসুমে কাজের চাপ যেমন বাড়ে, তেমনি দিনমজুরদের আয়ও বাড়ে।

স্থানীয় আড়তদার নিখিল হালদার বলেন, চলতি মৌসুমে প্রায় এক কোটি টাকার আমড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে তাঁর। আমড়ার মৌসুমি ব্যবসা থেকেই পরিবারের সারা বছরের ব্যয়ের বড় একটি অংশ আসে।

জিআই স্বীকৃতিতে বাড়ছে সম্ভাবনা

বরিশালের আমড়া জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এ ফলের বাজার ও সম্ভাবনা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বিশেষ স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি-সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘বরিশালের আমড়া’র আলাদা চাহিদা রয়েছে।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার কাপুরাকাঠি ইউনিয়নের কৃষক ও ইউপি চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, জিআই স্বীকৃতির পর আমড়ার গুরুত্ব বেড়েছে। চলতি বছর ফুল কম হওয়ায় ফলন কিছুটা কম হলেও ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকেরা সন্তুষ্ট। গত বছর যেখানে মানভেদে প্রতি মণ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে, এবার শুরুতেই ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পাওয়া যাচ্ছে।

কৃষকেরা জানান, চলতি বছরের শুরুতে দীর্ঘ সময় বৃষ্টির ঘাটতি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে আমড়ার ফুল ঝরে যায়। এতে কিছু এলাকায় ফলন কমেছে। তবে বাজারদর ভালো থাকায় কৃষকেরা সেই ঘাটতি অনেকটাই সামাল দিতে পারছেন।

পিরোজপুরে উৎপাদন বেশি, ঝালকাঠিরও বড় অংশ

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাতেই কমবেশি আমড়ার চাষ হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বিভাগে প্রায় ১ হাজার ৮৪৯ হেক্টর জমিতে আমড়ার আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার টন।

উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর। জেলাটিতে ৫৭৭ হেক্টর জমিতে প্রায় ১০ হাজার ১২৪ টন আমড়া উৎপাদনের তথ্য দিয়েছে কৃষি বিভাগ। ঝালকাঠিতে ৬০২ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫৭৮ টন। এ ছাড়া পটুয়াখালীতে ৩১৫ হেক্টর, বরিশালে ২৫১ হেক্টর, বরগুনায় ৭২ হেক্টর এবং ভোলায় ৩২ হেক্টর জমিতে আমড়ার চাষ হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, একই সময়ে বিভাগে ২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়েছে। অনেক এলাকায় পেয়ারার জায়গায় ধীরে ধীরে আমড়ার আবাদ বাড়ছে।

পদ্মা সেতু বদলে দিয়েছে বাজারের হিসাব

আমড়ার বাজার সম্প্রসারণে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চল থেকে রাজধানীতে ফল পরিবহনের সময় অনেক কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঝালকাঠি থেকে এখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমড়া ঢাকাসহ বড় শহরের বাজারে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।

রংপুরের ফল ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান প্রতিবছর ঝালকাঠি থেকে আমড়া কেনেন। তিনি জানান, দাম কিছুটা বেশি হলেও ঝালকাঠির আমড়ার স্বাদ ও মানের কারণে ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা রয়েছে।

স্বরূপকাঠির পাইকার নোমান বলেন, স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে আমড়া কিনে ঢাকায় পাঠান তাঁরা। প্রতি মণে কিছু লাভ থাকলেও শ্রমিক, পরিবহন ও খাবারের খরচ বাদ দিলে প্রকৃত লাভ অনেকটাই কমে যায়।

কৃষকের চাওয়া সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা

আমড়ার আবাদ ও বাজার বাড়লেও কৃষকদের বড় সীমাবদ্ধতা এখনো সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ। স্থানীয় চাষিদের মতে, পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার না থাকায় মৌসুমে উৎপাদিত ফল দ্রুত বিক্রি করতে হয়। আবার আমড়া দিয়ে আচার, জ্যাম, জেলিসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা সম্ভব হলেও স্থানীয়ভাবে বড় কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে ওঠেনি।

ভীমরুলীর আমড়াচাষি নিত্যানন্দ সমাদ্দার বলেন, স্থানীয় বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি ফল সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করা গেলে কৃষকেরা আরও বেশি লাভবান হতেন।

ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমড়ার উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং বাজারে চাহিদা থাকায় কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক চাষপদ্ধতি নিয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, আমড়া তুলনামূলকভাবে সহজে নষ্ট হয় না। ফলে বাজারজাত করার ক্ষেত্রে কৃষকের হাতে কিছুটা সময় থাকে। আমড়া ও পেয়ারা দিয়ে জ্যাম-জেলিসহ মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরিতে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই ফলকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে কৃষি, ব্যবসা ও পর্যটন—তিন ক্ষেত্রেই সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

আমড়াকে ঘিরে নতুন অর্থনীতির স্বপ্ন

ঝালকাঠির নদী-খালঘেরা বাগান থেকে ভীমরুলীর ভাসমান হাট, সেখান থেকে আড়ত হয়ে দেশের বিভিন্ন বাজার—আমড়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে একটি দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থা। এতে যুক্ত হচ্ছেন কৃষক থেকে শুরু করে শ্রমিক, পাইকার, আড়তদার ও পরিবহনকর্মীরা।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১২ কোটি টাকার আমড়া উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই বাজারের পরিধি আরও বাড়াতে হলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য, সংরক্ষণব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক বাজারজাতকরণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

তবে বর্তমান চিত্র বলছে, একসময় পেয়ারার ওপর নির্ভরশীল ঝালকাঠির কৃষিতে আমড়া ইতোমধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ভীমরুলীর ভাসমান হাটে নৌকার পর নৌকা আমড়া আর বেচাকেনায় ব্যস্ত কৃষক-ব্যবসায়ীদের দৃশ্য যেন সেই পরিবর্তনেরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

এম.সি.এইচ
আরও পড়ুন