বিশ্বের মোট ঋণ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বেড়ে রেকর্ড ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ঋণের এই বিশাল অঙ্কের পাশাপাশি বাড়ছে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও। ফলে বিভিন্ন দেশের সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) সর্বশেষ গ্লোবাল ডেট মনিটর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে।
আইআইএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বের মোট ঋণ বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩১১ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বছরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট মূল্যের তুলনায় ঋণের পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি।
এ হিসাবের মধ্যে রয়েছে চারটি প্রধান খাতের ঋণ—সরকারি ঋণ, পরিবারের ঋণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ এবং আর্থিক খাতের বাইরের কোম্পানিগুলোর ঋণ। তাই ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারকে শুধু বিভিন্ন দেশের সরকারের ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
আইআইএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও মোট ঋণ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
ঋণ বাড়ার পাশাপাশি সুদের ব্যয় বৃদ্ধি এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। ২০২২ সালের পর বিভিন্ন দেশের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় নতুন ঋণ নেওয়া এবং পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন—দুটিই ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) গ্লোবাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সরকার ও কোম্পানিগুলো বন্ড বাজার থেকে মোট ২৯ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে পারে। এই পরিমাণ ২০২৪ সালের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।
ওইসিডির হিসাবে, ২০২৫ সালে সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় সরকারগুলোর ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ছিল ১৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে তা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় সরকার ও কোম্পানিগুলোর অর্থায়ন ব্যয়ও বাড়ছে।
ঋণের একটি বড় অংশ নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করার পরিবর্তে আগের ঋণ পরিশোধ বা পুনঃঅর্থায়নে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে ব্যয় করার সুযোগ সীমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ঋণসংকটের ঝুঁকি শুধু দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নত অর্থনীতির কয়েকটি দেশও সরকারি ঋণ ও সুদের ব্যয় নিয়ে চাপে রয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে আইআইএফের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, উন্নত অর্থনীতির সরকারগুলোর সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সুদের ব্যয় জিডিপির অনুপাতে ১ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ঋণের পরিমাণ বেশি হলেই কোনো দেশ অবধারিতভাবে সংকটে পড়বে—এমন নয়। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, ঋণের মেয়াদ, সুদের হার, সরকারের রাজস্ব আয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নির্ভর করে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা। তবে ঋণের সুদ যদি রাজস্ব আয়ের বড় অংশ গ্রাস করতে থাকে, তাহলে নতুন সংকট মোকাবিলার আর্থিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাপী ঋণ বৃদ্ধির পেছনে সরকারি ব্যয়, বাজেট ঘাটতি, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতো বিভিন্ন কারণ রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো, জ্বালানি খাত এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়েও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে।
আইআইএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঋণ বৃদ্ধির পেছনে শুধু কোনো একক অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের চাহিদাও কাজ করছে। স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ঋণের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
উচ্চ সুদের পরিবেশে যেসব দেশ বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নেয়, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে ডলার বা অন্য বিদেশি মুদ্রায় নেওয়া ঋণ পরিশোধের খরচ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারি রাজস্ব দুর্বল হলে ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের এ ওয়ার্ল্ড অব ডেট ২০২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সরকারি ঋণের পরিমাণ ১১১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ঋণ পরিশোধের ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে গেলে উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণে ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশ্বের মোট ঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো তাই শুধু একটি বড় পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সুদের ব্যয়, সরকারি বাজেটের চাপ, বিনিয়োগের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন।
ঋণকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগানো, সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখাই এখন দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের হামলায় অর্থায়নের অভিযোগ
দেশের বাজারে কমলো সোনা-রুপার দাম, ভরি কত?
বাংলাদেশসহ ২০ দেশের ৭২১ নাগরিককে ফেরত পাঠালো কম্বোডিয়া