পুরো গাজা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ‘পূর্ণ বিজয়’ সম্ভব নয়

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

গাজায় ইসরায়েলের ঘোষিত ‘পূর্ণ বিজয়’ অর্জন করা বাস্তবে সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সাবেক কূটনীতিক আলন পিংকাস। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইসরায়েল যদি এই লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, তাহলে পুরো গাজা উপত্যকা দখল করে সেখানে সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পিংকাসের ভাষায়, পুরো গাজা দখল করার অর্থ হবে উপত্যকাটিতে যা কিছু ঘটবে, তার দায়িত্বও ইসরায়েলের ওপর বর্তানো। তার মতে, এই বাস্তবতা ‘পূর্ণ বিজয়’-এর ধারণাকে আরও জটিল করে তোলে।

পিংকাস বলেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য যদি সত্যিই ‘পূর্ণ বিজয়’ হয়, তাহলে এর একমাত্র পথ পুরো গাজা উপত্যকা দখল করা। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে গাজার প্রায় সবকিছুর নিরাপত্তা, প্রশাসন, মানবিক সহায়তা ও জনজীবন দায়িত্ব ইসরায়েলের ওপর পড়বে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, গাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং খাদ্য ও মৌলিক প্রয়োজনীয়তার সংকটে রয়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধ ও ব্যাপক ধ্বংসের কারণে স্থানীয়ভাবে খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পিংকাস আরও বলেন, গাজার জনসংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার যে ধারণা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়। তিনি এটিকে নৈতিকভাবেও কঠোরভাবে সমালোচনা করেন এবং বলেন, প্রায় ২০ লাখ মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার বাস্তবসম্মত কোনো উপায় নেই। তবে এসব মন্তব্য পিংকাসের নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্যায়ন। গাজার জনসংখ্যা বা বাস্তুচ্যুত মানুষের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এবং যুদ্ধের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব আলাদা হতে পারে।

‘বোর্ড অব পিস’ নিয়েও প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পিংকাস। তার দাবি, সংস্থাটির কার্যক্রম বাস্তবে প্রত্যাশিত পর্যায়ে এগোয়নি এবং এটি বর্তমানে মূলত কাগজে-কলমে বিদ্যমান। তবে বোর্ড অব পিসের নিজস্ব রোডম্যাপে গাজা নিয়ে একটি বিস্তারিত কাঠামো প্রকাশ করা হয়েছে। ৩০ জুলাই প্রকাশিত ওই নথিতে ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে গাজা থেকে প্রত্যাহার, ফিলিস্তিনি প্রশাসনের হাতে বেসামরিক ও নিরাপত্তা দায়িত্ব হস্তান্তর এবং পুনর্গঠনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। একই নথিতে হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়াকে ইসরায়েলি প্রত্যাহারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বোর্ড অব পিসের অবস্থান অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ধাপে ধাপে গাজা থেকে প্রত্যাহার করবে। একই সঙ্গে নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কাউকে জোর করে গাজা থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হবে না।

প্রত্যাহার নিয়ে মতপার্থক্য
বাস্তবে এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। আগস্টে বোর্ড অব পিসের পক্ষ থেকে বলা হয়, হামাসের অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরে প্রত্যাহার করবে না। হামাসের পক্ষ থেকে পাল্টা বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে তার নিজস্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

বোর্ড অব পিসের গাজা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ সেপ্টেম্বরেও বলেন, গাজায় অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা, অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এই প্রক্রিয়াগুলো এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। একই সময়ে তিনি সতর্ক করেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান পরিস্থিতি দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।

ইসরায়েলি রাজনীতিতে ‘পূর্ণ বিজয়’ কথাটি হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্য বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু পিংকাসের বক্তব্যে সেই লক্ষ্যের সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে- হামাসকে দুর্বল করার পাশাপাশি গাজার প্রায় পুরো ভূখণ্ডের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব কে নেবে? একদিকে ইসরায়েল হামাসের নিরস্ত্রীকরণকে নিরাপত্তার পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বোর্ড অব পিসের রোডম্যাপে ফিলিস্তিনি প্রশাসন, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী এবং ধাপে ধাপে ইসরায়েলি প্রত্যাহারের কাঠামো রাখা হয়েছে। ফলে পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন নির্ভর করছে একাধিক পক্ষের প্রতিশ্রুতি ও পারস্পরিক পদক্ষেপের ওপর।

এই পরিস্থিতিতে আলন পিংকাসের মন্তব্য গাজা যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ককে সামনে এনেছে- সামরিক লক্ষ্য অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক ও মানবিক দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য কোথায়। তার বক্তব্য হলো, পুরো গাজা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ‘পূর্ণ বিজয়’ অর্জন সম্ভব নয়; আর পুরো গাজা নিয়ন্ত্রণ নিলে সেই ভূখণ্ডের মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার দায়িত্বও নিয়ন্ত্রণকারী শক্তির ওপর বর্তাবে।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত