ইরানের সামরিক শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা ভূগর্ভস্থ সামরিক ঘাঁটি নয়; দেশটির বিস্তৃত সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থাও সামরিক সরঞ্জাম, সেনা ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থানান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে ইরানের রেল নেটওয়ার্কে ৬৭০টি বড় সেতু ও ৩৮০টি বড় টানেলের তথ্য উঠে এসেছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটির প্রধান ২৫টি সড়কপথ যেগুলো বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র, সামরিক ঘাঁটি এবং শহরকে যুক্ত করে এসব পথেও প্রায় ৮০০টি সেতু ও ৯০টি বড় টানেল রয়েছে। সড়ক ও রেলপথের এই অবকাঠামো সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির একটি বৈশিষ্ট্য হলো- উৎপাদন, সংরক্ষণ ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থাকে একক স্থানে কেন্দ্রীভূত না রেখে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রাখা। দেশটির ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো পাহাড় ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। এসব ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো বাইরে নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এই ব্যবস্থায় সড়ক ও রেল যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থির কোনো সামরিক স্থাপনা শনাক্ত বা আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়লে মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
এপ্রিলের এক সামরিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ইরানের রেল ও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর হামলা দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সে সময় তেহরান, জাঞ্জান ও তাবরিজকে যুক্ত করা কয়েকটি রেলপথে হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এই অবকাঠামোর গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। দেশের পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমের বড় অংশ পর্বতময়। বিশেষ করে জাগরোস পর্বতমালা অতিক্রম করে সামরিক ও বেসামরিক পরিবহন চালাতে সেতু ও টানেলের ওপর নির্ভরতা বেশি।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরানের ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রায় ৯০০টি বড় সেতু ও টানেল রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু স্থাপনা একাধিক মহাসড়ক বা রেলপথের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে একই সঙ্গে একাধিক পরিবহনপথে প্রভাব পড়তে পারে। রেল নেটওয়ার্কেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। ৬৭০টি বড় সেতু এবং ৩৮০টি বড় টানেল দীর্ঘ রেলপথকে বিভিন্ন অঞ্চল ও সামরিক-শিল্পকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। এসব অবকাঠামোর বড় অংশ বেসামরিক ও সামরিক দুই ধরনের পরিবহনের জন্যই ব্যবহৃত হয়।
২০২৬ সালের চলমান সংঘাতে ইরানের সড়ক, সেতু ও টানেলও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি হরমোজগান প্রদেশে কয়েক দফা মার্কিন হামলায় সেতু, টানেল ও রেল যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বান্দার আব্বাসের আশপাশে দুই দিনে অন্তত ছয়টি সেতু ও একটি টানেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব হামলার একটি উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবী গার্ডের ঘাঁটিগুলোর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ ব্যাহত করা।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের আরেক প্রতিবেদনে হরমোজগান প্রদেশে বান্দার আব্বাসের সঙ্গে রুদান ও অন্যান্য এলাকার সংযোগকারী সড়কে একাধিক সেতু ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলা হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। তবে কোনো সেতু বা টানেল ধ্বংস হওয়াকে সরাসরি ইরানের সামরিক সক্ষমতা অচল হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। ইরানের বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্ক, বিকল্প রুট এবং পাহাড়ি ভূখণ্ড সামরিক পরিবহনের জন্য একাধিক পথ তৈরি করে।
এছাড়া দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর বড় অংশ ভূগর্ভস্থ এবং বিকেন্দ্রীভূত। ওয়াশিংটন পোস্টের স্যাটেলাইট-ভিত্তিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির টানেল প্রবেশপথ ও অন্যান্য অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব স্থাপনার ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক হতে পারে এবং ইরান পুনরায় খনন ও মেরামতের মাধ্যমে কিছু সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
ইরানের ক্ষেত্রে তাই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হয়ে উঠেছে ‘লজিস্টিক যুদ্ধ’; অর্থাৎ সেনা, ক্ষেপণাস্ত্র, জ্বালানি ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। রেলপথের ৬৭০ সেতু ও ৩৮০ টানেল এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর শত শত সেতু ও টানেল এই ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলো একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চলাচল, বাণিজ্য ও সামরিক পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় যেকোনো বড় ধরনের ক্ষতি সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি বেসামরিক জীবন ও অর্থনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ইরানের সামরিক অবকাঠামো বিশ্লেষণে শুধু ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র দেখলেই পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। দেশের বিস্তৃত সড়ক, রেল, সেতু ও টানেলের নেটওয়ার্কও ইরানের সামরিক গতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৬ জনকে হত্যা করেছে আইআরজিসি
পুরো গাজা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ‘পূর্ণ বিজয়’ সম্ভব নয়
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারেই নতুন পথ খুলবে: আইআরজিসি
ফ্লাইদুবাই বিমানে সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ আমিরাতের