ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী কে এই মেহরদাদ আখলাঘি?

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১২ এএম

ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, সলিড-ফুয়েল প্রপালশন ও সামরিক শিল্পে চার দশকের বেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন মেহরদাদ আখলাঘি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোই তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন দেশটির সামরিক শিল্প ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তাঁর দায়িত্ব হবে এসব সক্ষমতা পুনর্গঠন, আধুনিকায়ন এবং আরও সম্প্রসারণ করা।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে আখলাঘির ৪২ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিন, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।

সামরিক শিল্পে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে আখলাঘি ইরানের শাহিদ বাঘেরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ, অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন এবং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে দেশটির গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ প্রযুক্তি উন্নয়ন, সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে আখলাঘি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। তাঁর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে দেশটির বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমিকা রেখেছেন আখলাঘি।

এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে সেজ্জিল ও জুলফিকার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন সংস্করণ এবং আলমাস ক্ষেপণাস্ত্র ও ইয়াসিন গাইডেড বোমার মতো নির্ভুল আঘাত হানার অস্ত্র। এ ছাড়া মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের রকেট, গবেষণামূলক রকেট এবং সেমনান প্রদেশের ইমাম খোমেনি স্পেস সেন্টার-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্পর্কেও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানো অগ্রাধিকার

ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালায়ি-নিক চলতি মাসে বলেছেন, আখলাঘিকে দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে কৌশলগত অস্ত্রের পরিমাণ ও মান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান আক্রমণাত্মক অস্ত্রের উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হলেও দেশটির হাতে উল্লেখযোগ্য আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা রয়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব অস্ত্রের উন্নয়নও করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে ইরান।

তবে ইরানের সামরিক শিল্পের কতটা সক্ষমতা অক্ষত রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে কত সময় লাগবে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।

যুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা

দায়িত্ব নেওয়ার আগে আখলাঘি দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁদের মধ্যে আইআরজিসির সর্বাধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ওয়াহিদিও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজনগুলো চিহ্নিত করাই ছিল এসব আলোচনার উদ্দেশ্য।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে সামরিক শিল্পের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেবেন তিনি।

নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পরিকল্পনা দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্তৃপক্ষ, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের অনুমোদন পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করবে না। তবে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর হামলা হলে শেষ পর্যন্ত তা রক্ষায় লড়াই করবে।

যুক্তরাষ্ট্রকে আখলাঘির হুঁশিয়ারি

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর রোববার প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আখলাঘি। ইরানের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির প্রসঙ্গ টেনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেন।

আখলাঘি বলেন, ইরান প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে এবং উদ্বেগ ছাড়াই নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিজেদের সেনাদের অক্ষত অবস্থায় সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা।

তিনি আরও হুমকি দেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি একটি বোমাও নিক্ষেপ করে, তাহলে কতজন মার্কিন সেনাকে আহত বা নিহত অবস্থায় সরিয়ে নিতে হবে, তা দেখতে হবে।

আখলাঘির এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইরানের নতুন প্রতিরক্ষানেতৃত্ব সামরিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরোধ করার বার্তাও দিতে চাইছে। তবে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইরানের সামরিক শিল্প কতটা সক্ষম হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন অবকাঠামো, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং চলমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতির ওপর।

এমইউ
আরও পড়ুন