ফ্রান্সে নতুন করে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা ঠেকাতে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শনিবারের (২৪ অক্টোবর) বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করতে অভিজাত নিরাপত্তা দল ও ভারী অস্ত্রসজ্জিত মোবাইল ইউনিটও মাঠে নামানো হবে। গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দাঙ্গা, লুটপাট ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাঁর অভিযোগ, ‘চরম বামপন্থী’ গোষ্ঠীগুলো অনলাইনে কর্মীদের সরকারি ভবনে হামলা চালানো এবং আরও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আহ্বান জানাচ্ছে।
নুনেজ বলেন, শনিবারের কর্মসূচিকে সাধারণ ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে এবং তারা সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কঠোরতা বজায় রাখবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবা নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবা খাতের ওপর চাপ নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন রাস্তায় নেমেছে। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও তরুণদের কিছু দল সহিংসতা ও লুটপাট চালাচ্ছে।
দেশটির কয়েকজন ডানপন্থী রাজনীতিক চলমান অস্থিরতার জন্য অভিবাসী ও উগ্র ইসলামপন্থীদের দায়ী করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এর মধ্যেই শুক্রবার প্যারিসের পশ্চিমে গাড়ি থেকে গুলি চালানোর ঘটনায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব থেকে ওই হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে। এতে একজন নিহত এবং ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীসহ চারজন আহত হয়েছেন।
স্থানীয় মেয়র আলি রাবেহ ঘটনাটিকে স্পষ্টতই বর্ণবাদী হামলা বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, উগ্র ডানপন্থীদের বক্তব্য এ ধরনের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে।
প্যারিসে বিক্ষোভের অনুমতি সীমিত
শনিবার প্যারিসে কেবল একটি শ্রমিক সংগঠনের বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউএনইএফ এবং ২০১৮ সালে আত্মপ্রকাশ করা সরকারবিরোধী আন্দোলন ‘ইয়েলো ভেস্টস’-এর বিক্ষোভের আবেদন নাকচ করা হয়েছে।
প্যারিসের বাইরে আরও কয়েকটি শহরেও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়ে আগে জারি করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে শ্রমিক সংগঠনের একটি কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ইউএনইএফ জানিয়েছে, গত মাসে শিক্ষকসংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে স্কুলশিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে তাদের বিক্ষোভের সূত্রপাত। অনুমতি না পেলেও সংগঠনটি কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিএফডিটির মহাসচিব মেরিলিজ লিওঁ প্রেসিডেন্ট মাখোঁর সমালোচনা করে বলেছেন, আরও বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়া উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে এবং তারা নিজেদের কথা শোনানোর সুযোগ চায়। কে বৈধভাবে বিক্ষোভের আবেদন করতে পারবেন, তা প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তের বিষয় হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিরাপত্তায় অতিরিক্ত বাহিনী ও ড্রোন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ জানান, গত সপ্তাহের তুলনায় এবার আরও ১০ হাজার পুলিশ সদস্য বেশি মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি ঘোড়সওয়ার পুলিশ, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। প্রয়োজন হলে সাঁজোয়া যান ও জলকামানও প্রস্তুত রাখা হবে। সংবেদনশীল কিছু এলাকায় গত সপ্তাহে জারি করা কারফিউও বহাল থাকবে।
এদিকে, চলতি সপ্তাহান্তে অর্লেয়াঁ শহরে উগ্র ডানপন্থী নেতা মেরিন লো পেনের দল ন্যাশনাল র্যালির বার্ষিক সম্মেলন ঘিরেও সংঘাতের আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। বামপন্থী ও বর্ণবাদবিরোধী সংগঠনগুলো সেখানে পাল্টা বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সহিংসতার পর জনমত জরিপে লো পেনের সমর্থন বেড়েছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি এগিয়ে রয়েছেন বলে জরিপে দেখা যাচ্ছে। লো পেন চলমান অস্থিরতাকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বন্ধ থাকবে জাদুঘর, বদলেছে ফুটবল ম্যাচের সময়
নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর, মুসে দ’অর্সে এবং অপেরা হাউসসহ কয়েকটি বিখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান শনিবার সারাদিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগে ফরাসি ফুটবল লিগ ওয়ানে প্যারিস সাঁ জারমাঁ ও অলিম্পিক লিওঁর মধ্যকার ম্যাচটি রোববারের পরিবর্তে সোমবার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্যারিসে রোববার পিটসবার্গ স্টিলার্স ও নিউ অরলিন্স সেইন্টসের মধ্যকার এনএফএল নিয়মিত মৌসুমের ম্যাচটি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ম্যাচটি বাতিল করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন।
গত সপ্তাহান্তে প্রায় তিন হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়েছিল। এ ঘটনার পর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দোকানপাট বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট অ্যালাঁ দি ক্রেসেনজো জানান, কিছু দোকানমালিক নিজেদের সম্পদ রক্ষায় বেসবল ব্যাট, লোহার শাবল ও আগ্নেয়াস্ত্র রাখছেন। তবে তিনি তাঁদের সহিংসতার পথে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
চলমান অস্থিরতা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস শুক্রবার ফ্রান্সের ঋণমান কমাতে পারে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্রেপ্তার হলেই বাতিল হবে মার্কিন ভিসা, সতর্ক করলো দূতাবাস
নতুন সেতু দিয়ে চীনে গেলেন কিম জং উন
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে কমছে বৈশ্বিক তেলের মজুত, রিজার্ভ কত?