অর্থনীতির একাল-সেকাল

সামরিক শক্তিতে বলীয়ান ইরান কি ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে? 

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৭ এএম

ইরান মানেই এক ভূরাজনৈতিক উত্তজনা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছাপিয়ে দেশটি সামরিকভাবে নিজেদের সক্ষমতা জানান দিলেও, ভেতর থেকে দেশটির অর্থনীতি ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের শুরুতে এসে দেখা যাচ্ছে, একদিকে ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে দেশটির সাধারণ মানুষ ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির কবলে পিষ্ট হচ্ছে।

বিপ্লবের আগে ও পরে: এক বিপরীত চিত্র

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের অর্থনীতি ছিল দ্রুত বর্ধনশীল। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে শাহের আমলে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। কিন্তু বিপ্লব-পরবর্তী চার দশকে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। ১৯৮২ সালে প্রবৃদ্ধি ২৩ শতাংশে উঠলেও ২০১০ সালের পর থেকে দেশটি বারবার অর্থনৈতিক সংকোচনের মুখে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশটির মাথাপিছু আয় কমেছে এবং প্রায় এক কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।

রিয়ালের পতন ও মুদ্রাস্ফীতি

১৯৭৯ সালে এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যেত ৭০ ইরানি রিয়াল। ২০২৬ সালের শুরুতে তা রেকর্ড ভেঙে ১৪ লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ গত চার দশকে মুদ্রার মান কমেছে প্রায় ২০ হাজার গুণ। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৪৮.৬ শতাংশে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

সমান্তরাল অর্থনীতি ও আইআরজিসির আধিপত্য

ইরানের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণে। 'প্রতিরোধ অর্থনীতি'র আড়ালে তেল, গ্যাস, বন্দর ও টেলিকম খাতের মতো লাভজনক খাতগুলো সামরিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর কবজায় চলে গেছে। এর ফলে বেসরকারি খাত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি শিকড় গেড়েছে।

নিষেধাজ্ঞা ও তেলের ‘শ্যাডো ফ্লিট’

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান ছদ্মবেশে তেল বিক্রি করতে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, সরাসরি বিক্রি করতে না পারায় ইরানকে প্রতি বছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় দিতে হচ্ছে। মধ্যস্থতাকারী ও 'শ্যাডো ফ্লিট' বা ছায়া জাহাজের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করতে গিয়ে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাচ্ছে।

জনরোষ ও ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ

তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা, যারা একসময় বিপ্লবের কট্টর সমর্থক ছিল, এখন তারাই সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সংকট কেবল নিষেধাজ্ঞার ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের ত্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঞ্চিত ফল। ইরান এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামরিক দাপট থাকলেও ভঙ্গুর অর্থনীতি দেশটির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

DR/AHA
আরও পড়ুন