পারমাণবিক হামলা হলে ইরান প্রতিরোধ করবে কিভাবে?

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩২ এএম

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে—এমন দাবি ঘিরে নতুন করে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে ইরানের হাতে আদৌ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে কি না, কিংবা দেশটি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির সক্ষমতার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে—তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কংগ্রেসওমেন মার্জরি টেলর গ্রিনের বক্তব্যের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তিনি দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন কৌশলগত বৈঠকগুলোতে ইরানের ওপর পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। যদিও এ দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক ল্যারি জনসন সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ওপর একটি পারমাণবিক হামলা হলে এর প্রভাব শুধু ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বের অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তও বদলে যেতে পারে।

ল্যারি জনসনের মতে, ইরানের ওপর পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হলে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া এবং সম্ভবত পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যেতে পারে। তাঁর ভাষায়, এটি এমন এক ‘প্যান্ডোরাস বক্স’, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনোভাবেই খোলা উচিত নয়।

বিশ্লেষকদের একটি অংশের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের দীর্ঘদিনের অলিখিত সীমারেখা ভেঙে যেতে পারে। এতে অন্য দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে আরও আগ্রাসী অবস্থান নিতে পারে।

বিশেষ করে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও এমন আশঙ্কা রয়েছে যে, ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলা হলে রাশিয়া ভবিষ্যতে কোনো সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম বাধা অনুভব করতে পারে। একইভাবে চীন, উত্তর কোরিয়া বা পাকিস্তানের কৌশলগত হিসাবও বদলে যেতে পারে।

ইরানের হাতে বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে কি না—এটি এখনো একটি বড় প্রশ্ন। দেশটির ইউরেনিয়াম কতটা সমৃদ্ধ হয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা তথ্য ও দাবি থাকলেও অস্ত্র তৈরির পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

এখানেই ইরানের একটি সম্ভাব্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। ইরান যদি সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে থাকে, কিংবা ইতিমধ্যে কোনো ধরনের ওয়ারহেড প্রস্তুত করে থাকে, তাহলে প্রতিপক্ষের জন্য দেশটির ওপর সরাসরি পারমাণবিক হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

কারণ ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকার সম্ভাবনা থাকলে হামলাকারীকে একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে—ইরান কি পাল্টা পারমাণবিক হামলা চালাতে সক্ষম?

কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের আশঙ্কা

কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, ইরানের কাছে প্রয়োজনীয় উপাদান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলে পারমাণবিক ওয়ারহেড প্রস্তুত করতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসরায়েল বা অন্য কোনো পক্ষের পারমাণবিক হামলার জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালানোর চেষ্টা করতে পারে।

তবে ইরান ইতিমধ্যে কোনো পারমাণবিক ওয়ারহেড প্রস্তুত করে রেখেছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট পারমাণবিক বিভাগের বাইরে এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য কতজনের কাছে রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট নয়।

ফলে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তাই এক ধরনের ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

পারমাণবিক হামলা হলে কী হতে পারে?

ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলা হলে তা কেবল একটি সামরিক অভিযান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। মধ্যপ্রাচ্যে তাৎক্ষণিক পাল্টা হামলা, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিক্রিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের বিস্তার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নজির তৈরি হওয়ার ঝুঁকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও নৈতিক বাধা তৈরি হয়েছে, ইরানের ওপর হামলা সেই অবস্থানকে আমূল বদলে দিতে পারে।

এই কারণেই পারমাণবিক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, ততই সামনে আসছে ‘পারমাণবিক প্রতিরোধ’ বা নিউক্লিয়ার ডিটারেন্স-এর বিষয়টি। ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে কি না—এমন অনিশ্চয়তাও যদি প্রতিপক্ষকে হামলা থেকে বিরত রাখে, তাহলে সেটিই দেশটির জন্য একটি কৌশলগত প্রতিরোধক হয়ে উঠতে পারে।

তবে ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলা নিয়ে বৈঠকে সত্যিই কী আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত এবং মার্জরি টেলর গ্রিনের দাবির স্বাধীন যাচাইও প্রয়োজন। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নয়; বরং কোনো পক্ষ প্রথমবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলে তার পরিণতি কোথায় গিয়ে থামবে—সেটিই।

Maz
আরও পড়ুন